সিরাজুল ইসলাম রনি, রাজশাহী-
রাজশাহী মহানগরীর ধরমপুর এলাকার সায়রা খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহনাজ বেগমের চাকরিরই বৈধতা নেই। নেই নিয়োগপত্র। পদে সহকারী শিক্ষক। সেখান থেকে হয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হয়েই কাটছে প্রায় দশ বছর। কোনো কিছু না থাকলেও প্রায় দেড় দশক ধরে রাজশাহী-২ সদর আসনের সাবেক এক এমপির সাথে যোগসাজস করেই টিকিয়ে রেখেছেন চাকরি। অবৈধ চাকরি হলেও তার উপর লাগেনি নূন্যতম আঁচড়। তথ্যমতে, ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারী শাহনাজ বেগম সায়রা খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে যোগদান করেন (প্রতিষ্ঠাকালীন ও অস্থায়ী)। তাঁর সাথে আরো বেশ কয়েকজন শিক্ষক এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৯৮ সালে বিধিমোতাবেক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ বিদ্যালয়ে শিক্ষকসহ অন্যান্য পদের কর্মচারিদের নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়। নিয়োগের সময় পদ না থাকায় শাহনাজ বেগমকে (বিপিএিড) বিষয়ে ডিগ্রি নেয়ার জন্য বলা হয়। তিনি রাজশাহী সরকারী শারীরিক শিক্ষা কলেজে ভর্তি হন। নেন ডিগ্রি। এরপর শরীরচর্চা পদ সৃষ্টি করে তাঁর নিয়োগ হওয়ার কথা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই পদে শাহনাজ বেগমকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আর নিয়োগ দিতে পারেননি। এমন কি পূর্বের নিয়োগ অনুযায়ীও তিনি সেই সনদপত্র বিদ্যালয়ে জমা দেননি।
দীর্ঘ সময় পর শিক্ষক শাহনাজ বেগম নিয়োগের বৈধতা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বৈধ নাকি অবৈধ এ বিষয়েটি প্রকাশ্যে এসেছে। শুরু হয়েছে নানান গুঞ্জন। তাঁর অবৈধ নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। অভিযোগ করা হয়েছে জেলা প্রশাসক বরাবর। এমন কি তার নিয়োগকে কেন্দ্র করে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে গত প্রায় ১৫ আগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ওই প্রধান শিক্ষক অবসরে গেলেও তার বরখাস্তাদেশ আজো বলবৎ রয়েছে। নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালের ৫ নভেম্বর সকাল ১০ টায় সায়রা খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ বিষয়ক একটি রেজুলেশন হয়। তৎকালীর বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সভাপতি আব্দুল হান্নানসহ এসময় নিয়োগ কমিটির সকল সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সেই সভায় করা রেজুলেশনে সিদ্ধান্ত মোতাবেক শাহনাজ বেগমের নিয়োগ স্থগিত করা হয়। কিন্তু একই দিন বিকেলে অপর একটি রেজুলেশনে দেখা যায়, শাহনাজ বেগমকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আগের রেজুলেশনে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতিসহ অন্যান্য সকলের স্বাক্ষর থাকলেও একই দিন বিকেলে শাহনাজ বেগমকে নিয়োগ দেয়া রেজুলেশনে অনেকেরই স্বাক্ষর নেই। সভাপতি একক ক্ষমতা বলে শাহনাজ বেগমকে নিয়োগ দিলেও পরে রেজুলেশনে প্রধান শিক্ষকের আর স্বাক্ষর হয়নি। যদিও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের সদস্য সচিব। এখন প্রশ্ন হলো প্রধান শিক্ষক যেখানে উপস্থিত নেই সেখানে শিক্ষক শাহনাজ বেগমকে নিয়োগপত্র দিলো কে?
জানা গেছে, শিক্ষক শাহনাজ বেগম অবৈধভাবে থাকলেও বিদ্যালয়ে তার ছিল দাপট। সেই দাপটে তিনি গত ২০১৬ সালে হন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। অপর এক শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত করা হলেও তিনি সভাপতির সাথে যোগসাজস করে তাঁকে বাদ দিয়ে তিনি নিজে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। কারণ তাঁর মাথার উপর ছায়া হয়ে ছিলেন রাজশাহী সদর আসনের এমপি ফজলে হোসেন বাদশা ও শাহনাজ বেগমের খালু ও বিদ্যালয়ের সভাপতি আব্দুল হান্নান। আর বিগত দিনের মতই এখনো তিনি দাপটের সাথেই চাকরি করছেন। সায়রা খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহনাজ বেগম তার নিয়োগ বৈধ দাবি করে বলেন, যারা নিয়োগ দিয়েছেন তারাই বলতে পারবেন আমি বৈধ নাকি অবৈধ। তবে তার কাছে নিয়োগ সক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি দেখাতে পারেন নি।
এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক নজিবর রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানটি এমপিও হওয়ার পর শিক্ষক কর্মচারিদের এমপিও করার জন্য মন্ত্রাণালয়ে কাগজপত্র পাঠানো হয়। সবার এমপিও হলেও বাদ পড়েন শাহনাজ বেগম। পরে শাহনাজ বেগম আমার স্বাক্ষর জাল করে কাগজপত্র জমা দেন মন্ত্রাণালয়ে। এতে তারও এমপিও হয়। কিন্তু আমি তার কাছে নিয়োগ ও এমপিও’র কাগজপত্র চাইলে তিনি দিতে পারেননি। যার কারণে ওই সময় তার বেতন বিলে আমি স্বাক্ষর করিনি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষক শাহনাজ বেগম সভাপতির সাথে যোগসাজস করে আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। যা অবসরে যাওয়ার পরও আজো বলবৎ রয়েছে। বিদ্যালয়ের সভাপতি আব্দুল হান্নান শাহনাজ বেগমের সম্পর্কে খালু হওয়ায় তিনি অবৈধভাবেই দাপটেই ছিলেন। তিনি শাহনাজ বেগমের নিয়োগপত্র নেই দাবি করে বলেন, শাহনাজ বেগমের অবৈধ নিয়োগের ব্যাপারে গত ২০১১ সালে আমি একটি মামলা করেছি। মামলা চলমান থাকার পরও তাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যা অবৈধ। এছাড়াও শাহনাজ বেগম নিয়োগের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারবেন না। সভাপতি জাল জালিয়াতি করে সেই সময় জাল নিয়োগপত্র তৈরি করে হয় তো দিয়েছেন। যা শাহনাজ বেগম বিদ্যালয়ে জমা দেননি বলে দাবি করেন তিনি। তবে বিদ্যালয়ের সভাপতি আব্দুল হান্নান মারা যাওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক শামীম হাসান জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষক নিয়োগ হলে বিধিমোতাবেক হতে হয়। তাছাড়া নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র অবশ্যই বিদ্যালয়েই থাকার কথা। ওই বিদ্যালয়ের ব্যাপারে আগেও আমি লোক মারফাত অনেক বিষয় জেনেছি। সায়রা খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহনাজ বেগমের বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ব্যাপারে সায়রা খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) বেলায়েত হোসেনের সাথে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জে/এ

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফজলুল হক মনোয়ার । নির্বাহী সম্পাদকঃ অধ্যাপক আবদুল জলিল । বার্তা সম্পাদকঃ এনামুল হক
সম্পাদনা পরিষদেঃ গোলাম মোস্তফা । সাইফুল ইসলাম নাবিল । কে এম আনোয়ার হোসেন । হাসানুল আহসান রীমন ।
প্রধান কার্যালয়ঃ সোনামুখী বাজার, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জে ।
যোগাযোগঃ ০১৮১৮-৫১৪৩১৩, ০১৭৪০-৯৯২৩২১, ০১৭১২-৩৮৫৪৪১ নম্বরে।
ইমেইলঃ badwipnews@gmail.com
সর্বস্ব সংরক্ষিত বদ্বীপ নিউজ © কপিরাইট – ২০২৬