
বিধান চন্দ্র সান্যাল-
বাংলা কথা সাহিত্যের ইতিহাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মূলত এক দরদি কথাশিল্পী হিসেবে পরিচিত, যাঁর লেখনীতে সমাজের অবহেলিত, অন্ত্যজ ও বঞ্চিত মানুষের বেদনার রূপায়ণ ঘটেছে বিশ্বস্ততার সাথে। কিন্তু এই মরমী রূপের আড়ালে তাঁর মধ্যে যে এক তীব্র সমাজ-সচেতন, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী এবং শ্রেণি-সচেতন রাজনৈতিক মনন লুকিয়ে ছিল, তার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ 'পথের দাবী' উপন্যাস। ১৯২৬ সালের আগস্ট মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত এই কালজয়ী উপন্যাসটি আজ এক শতক পূর্ণ করল। শতবর্ষের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা 'পথের দাবী'-কে নতুন করে পাঠ করি, তখন কেবল একটি ঔপনিবেশিক আমলের বিপ্লবী আন্দোলনের কাহিনি আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় না, বরং তার চেয়েও অনেক গভীরে থাকা এক বৈপ্লবিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের ইশতেহার আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। এই উপন্যাসটি কেবল এক দল বিপ্লবীর ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাস নয়, এটি হলো শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার, পুঁজিবাদের নগ্ন থাবার বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিরোধের এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের এক অনন্য তাত্ত্বিক আখ্যান।
শরৎচন্দ্র যখন এই উপন্যাসটি রচনা করছেন, তখন বিশ্বজুড়ে রুশ বিপ্লবের ঢেউ এসে লেগেছে পরাধীন ভারতবর্ষের বুকেও। মেহনতি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং শ্রেণির ভিত্তিতে সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তখন অবদমিত ভারতবর্ষের তরুণ সমাজকে আলোড়িত করছে। সেই যুগলক্ষণকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ধারণ করেছিলেন শরৎচন্দ্র। 'পথের দাবী' কোনো আকস্মিক সৃষ্টি নয়, বরং তৎকালীন বৈশ্বিক ও জাতীয় অর্থনৈতিক শোষণের পটভূমিতে এক অবধারিত সাহিত্যিক বিস্ফোরণ। ব্রিটিশ রাজের ঔপনিবেশিক নিপীড়ন কীভাবে এ দেশের সাধারণ মানুষকে চরম দারিদ্র্য ও দাসত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, এবং সেই দাসত্ব শুধু রাজনৈতিক ছিল না, বরং তা কীভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল, উপন্যাসটিতে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ রয়েছে। তৎকালীন সময়ে বইটি এতটাই প্রভাবশালী এবং ব্রিটিশ রাজশক্তির ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো উপাদানসমৃদ্ধ ছিল যে, প্রকাশের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯২৭ সালের জানুয়ারি মাসে ঔপনিবেশিক সরকার এটিকে রাজদ্রোহের অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই নিষেধাজ্ঞাই প্রমাণ করে যে, এই উপন্যাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা চেতনার আগুন কতখানি বিপজ্জনক ছিল স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চাওয়া শাসক ও শোষক শ্রেণির কাছে।
উপন্যাসের মূল চালিকাশক্তি এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচী কেবল একজন প্রথাগত বিপ্লবী নন, তিনি হলেন একাধারে বহুমাত্রিক জ্ঞানসম্পন্ন এক তাত্ত্বিক এবং অগ্রগামী সমাজবিপ্লবী। তাঁর চরিত্রটি নির্মাণের মাধ্যমে লেখক এমন এক নেতৃত্বের রূপরেখা তৈরি করেছেন, যা শুধু ক্ষমতার হস্তান্তর চায় না, বরং আমূল ব্যবস্থার পরিবর্তন কামনা করে। সব্যসাচীর বিপ্লবী ভাবনার পরিধি কেবল ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না; রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর তথা সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে তাঁর কর্মকাণ্ড বিস্তৃত ছিল। এই আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, তিনি মুক্তি আন্দোলনকে একটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সমন্বিত লড়াই হিসেবে দেখতেন। সব্যসাচী ভালো করেই জানতেন যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আসলে পুঁজিবাদেরই একটি রাজনৈতিক রূপ। তাই শুধু সাদা চামড়ার শাসক তাড়িয়ে দিলেই দেশের আসল মুক্তি আসবে না, যদি না এ দেশের কৃষক, শ্রমিক ও মজুরদের অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটে। তাঁর এই দর্শন আজকের দিনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যেখানে বিশ্বায়ন ও নব্য-সাম্রাজ্যবাদের যুগে শোষণের রূপ বদলেছে কিন্তু শোষিতের যন্ত্রণা একই রয়ে গেছে।
'পথের দাবী' উপন্যাসে শরৎচন্দ্র অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে শ্রমজীবী মানুষের প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। উপন্যাসের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে রেঙ্গুনের কারখানার শ্রমিকদের জীবনযন্ত্রণা ও তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। ব্রজেন্দ্র, রামদাসের মতো চরিত্রের মাধ্যমে কারখানার কুলিদের মানবেতর জীবন এবং শ্বেতাঙ্গ মালিকদের অমানবিক অত্যাচারের যে খণ্ডচিত্র লেখক এঁকেছেন, তা পুঁজি বনাম শ্রমের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে নির্দেশ করে। সব্যসাচী যখন এই শ্রমিকদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেন, তখন তা কোনো সাময়িক জনকল্যাণমূলক কাজ থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি সুনির্দিষ্ট অধিকার সচেতন আন্দোলন। শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন যে, বিপ্লবের প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো এই শ্রমজীবী জনতা, যাদের ঘাম ও রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে শোষকদের প্রাসাদ। শ্রমিকদের নিজস্ব চেতনা জাগ্রত না হলে এবং তারা নিজেদের শ্রেণির স্বার্থ না বুঝলে কোনো বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়—সব্যসাচীর এই দৃঢ় বিশ্বাস আসলে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব বা মেহনতি মানুষের সামগ্রিক উত্থানের ধারণাকেই মনে করিয়ে দেয়।
উপন্যাসটির অন্যতম প্রধান সম্পদ হলো এর সূক্ষ্ম ও গভীর সামাজিক সমালোচনা। শরৎচন্দ্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি বেশি জরুরি। ভারতীয় সমাজের জাতপাত, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা কীভাবে সাধারণ মানুষকে যুগ যুগ ধরে পরাধীন করে রেখেছে, তার তীব্র সমালোচনা পাওয়া যায় অপূর্বর চরিত্রের দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং ভারতীর যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতের মধ্য দিয়ে। অপূর্ব চরিত্রটি হলো তৎকালীন পেটি-বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক চমৎকার প্রতিনিধি, যে একদিকে দেশের স্বাধীনতা চায় কিন্তু অন্যদিকে নিজের জাত্যাভিমান, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং পারিবারিক সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করতে পারে না। তার এই সুবিধাবাদী চরিত্রটি সমাজ পরিবর্তনের পথে অন্যতম বড় বাধা। অন্যদিকে, ভারতী এবং সুমিত্রার মতো নারী চরিত্রগুলির মাধ্যমে লেখক সমাজে নারীর অবস্থান এবং বিপ্লবে তাদের অগ্রণী ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। সুমিত্রা যখন 'পথের দাবী'র সভানেত্রী হিসেবে শক্ত হাতে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মুখে এক বিরাট চপেটাঘাত। এটি প্রমাণ করে যে, মানবমুক্তির যে কোন আন্দোলনে নারীর সমান অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব ছাড়া তা পূর্ণতা পেতে পারে না।
শরৎচন্দ্র তাঁর এই উপন্যাসে ধর্ম ও রাজনীতির বিপজ্জনক মিশেলকেও তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন। সব্যসাচীর মুখে লেখক বলিয়েছেন যে, ধর্ম যখন মানুষের যুক্তিকে অন্ধ করে দেয় এবং শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা প্রগতির সবচেয়ে বড় শত্রু। সমাজকে অবদমিত রাখার জন্য শাসক শ্রেণি যেভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে, সেই সত্যটি উপন্যাসটিতে অত্যন্ত নিপুণ ভাবে উন্মোচিত হয়েছে। মানুষের আসল পরিচয় তার ধর্মে বা জাতে নয়, তার মানবিকতায় এবং শোষণের বিরুদ্ধে তার অবস্থানের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়—এই ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক জীবনবোধই উপন্যাসের প্রতি ছত্রে ধ্বনিত হয়েছে। এটি এমন এক প্রগতিশীল চিন্তার প্রতিফলন, যা সমাজকে অন্ধকারের বুক চিরে আলোর দিকে নিয়ে যেতে চায়।
উপন্যাসের নামকরণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর মূল দর্শন—'পথের দাবী'। এই পথ কোনো সহজ, মসৃণ বা আপোসের পথ নয়। এটি হলো বিপ্লবের পথ, অধিকার আদায়ের কণ্টকাকীর্ণ পথ। এই পথ দাবি করে চরম আত্মত্যাগ এবং প্রচলিত সমস্ত অন্যায্য নিয়মকানুনের ভাঙন। সব্যসাচীর বিপ্লববাদের সমান্তরালে ভারতীর অহিংস ও সেবামূলক দৃষ্টিভঙ্গির যে বিতর্ক লেখক উপস্থাপন করেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শরৎচন্দ্র নিজে হয়তো গান্ধীবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু এই উপন্যাসে তিনি বিপ্লবীদের সশস্ত্র ও আপসহীন সংগ্রামকে যেভাবে মহিমান্বিত করেছেন এবং তার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তিনি শোষকের বিরুদ্ধে যে কোনো উপায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন। যখন নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অধিকার আদায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন শোষিতের হিংসা আসলে শোষকের প্রাতিষ্ঠানিক হিংসার বিরুদ্ধে এক বৈধ আত্মরক্ষা—এই তত্ত্বই যেন সব্যসাচীর প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়।
শতবর্ষ পরে আজ যখন আমরা এই উপন্যাসের মূল্যায়ন করছি, তখন দেখতে পাই যে 'পথের দাবী'র আবেদন ফুরিয়ে যায়নি, বরং আরও তীব্র হয়েছে। আজকের দুনিয়ায় যখন পুঁজিপতিদের স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়, যখন কর্পোরেট সংস্কৃতির আড়ালে শ্রমিকের অধিকার হরণ করা হয়, তখন সব্যসাচীর সেই অমোঘ বাণীগুলি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। শরৎচন্দ্র কেবল তাঁর সময়ের কথা বলেননি, তিনি একটি চিরন্তন সত্যকে সাহিত্যরূপ দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, যতদিন সমাজে একজন মানুষ অন্য মানুষের দ্বারা শোষিত হবে, যতদিন পুঁজি ও শ্রমের বৈষম্য থাকবে, ততদিন 'পথের দাবী'র মতো সংগঠনের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে না। এটি কোনো অতীত দিনের রোমান্টিক বিপ্লবের গল্প নয়, এটি হলো চলমান জীবনের এক জীবন্ত সংগ্রাম।
উপন্যাসের শেষ ভাগে সব্যসাচীর সেই চিরবিদায়ের দৃশ্যটি প্রতীকী। তিনি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করে থেমে যাননি, বরং এক ঝড়-ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ রাতে নতুন কোনো দিগন্তে, নতুন কোনো শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য চলে গেছেন। এই গতিশীলতা নির্দেশ করে যে, মুক্তি কোনো স্থির বিন্দু নয়, এটি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। প্রগতির চাকা সচল রাখতে হলে লড়াই জারি রাখতে হবে অবিরত। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর অসামান্য অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে মেহনতি মানুষের এই চিরন্তন লড়াইকে যে মর্যাদা দিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। শতবর্ষে 'পথের দাবী' উপন্যাসটি তাই কেবল একটি ধুলো জমা ক্লাসিক গ্রন্থ নয়, এটি হলো মানবমুক্তির, সাম্যের এবং সামাজিক ন্যায় বিচারের এক প্রদীপ্ত মশাল, যা আগামী দিনেও শোষিত ও বঞ্চিত মানুষকে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে পথ দেখিয়ে যাবে। জে/এ
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফজলুল হক মনোয়ার । নির্বাহী সম্পাদকঃ অধ্যাপক আবদুল জলিল । বার্তা সম্পাদকঃ এনামুল হক
সম্পাদনা পরিষদেঃ গোলাম মোস্তফা । সাইফুল ইসলাম নাবিল । কে এম আনোয়ার হোসেন । হাসানুল আহসান রীমন ।
প্রধান কার্যালয়ঃ সোনামুখী বাজার, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জে ।
যোগাযোগঃ ০১৮১৮-৫১৪৩১৩, ০১৭৪০-৯৯২৩২১, ০১৭১২-৩৮৫৪৪১ নম্বরে।
ইমেইলঃ badwipnews@gmail.com
সর্বস্ব সংরক্ষিত বদ্বীপ নিউজ © কপিরাইট – ২০২৬