এমএফএইচ রাজু | ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় থানা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানকে অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা। আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও শিক্ষককে হয়রানিসহ ২৩টি অভিযোগে প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পর এ কর্মসূচি পালন করল শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল পৌনে ১১টা থেকে দুপুর পৌনে ১টা পর্যন্ত বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে তারা। পরে ভাণ্ডারিয়া ওভারব্রিজের পশ্চিম পাশে বরিশাল-ভাণ্ডারিয়া-মঠবাড়িয়া মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এতে ওই সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেয়।
প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ইউএনও ও বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে ২৩টি অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
নোটিশে উল্লিখিত বিভিন্ন আর্থিক অঙ্কের সরল যোগফল ১ কোটি ১৫ লাখ ৫ হাজার ৮৩০ টাকা। তবে এই অঙ্ককে চূড়ান্ত আত্মসাৎ বা দুর্নীতির পরিমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি; এটি নোটিশে বর্ণিত বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অঙ্কের যোগফল।
নোটিশের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণি থেকে আদায়কৃত অর্থসহ অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া আনুমানিক ৭৯ লাখ ৪ হাজার ৩৩০ টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা না দেওয়া এবং আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন না নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিস্তারিত অংশে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৭৫৪ টাকার ভুয়া বিল-ভাউচার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৯ লাখ ৬ হাজার ৫৭৬ টাকার হিসাব না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের আয় ব্যাংকে জমা না রেখে নগদে রাখা, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ ব্যয়, ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন ছাড়া ব্যয় এবং ব্যয়ের অনুমোদন রেজুলেশন বইয়ে লিপিবদ্ধ না করার অভিযোগ রয়েছে।
নোটিশে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ব্যয়ের সময় ভ্যাট ও আয়কর যথাযথভাবে কর্তন না করে গত আড়াই বছরে সরকারের প্রায় ১২ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ভাউচারে রাজস্ব স্ট্যাম্প ব্যবহারের বিধান অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে অর্থের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে নতুন ভর্তি হওয়া এক ছাত্রীকে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আগে রোলে অন্তর্ভুক্ত এবং তাকে ৪ নম্বর রোল দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে। উপবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও মাসিক বেতন নেওয়া এবং উপবৃত্তির বিপরীতে পাওয়া টিউশন ফি শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ না করার অভিযোগও করা হয়েছে।
নোটিশ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের ঋণকে বিদ্যালয়ের আয় হিসেবে দেখিয়ে পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে তা পরিশোধের নামে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে PBGSI স্কিমের আওতায় পাওয়া প্রায় ৫ লাখ টাকা বিধিমতো ব্যয় না করে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্কিম পরিচালকের কাছে ফেরত দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে সুবিধাবঞ্চিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে ল্যাব ফি নেওয়া হলেও বিদ্যালয়ের ল্যাব সচল না রাখায় শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক ক্লাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এমন অভিযোগও রয়েছে।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছাড়া এককভাবে সভা করে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রায় ১১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পরিশোধের সিদ্ধান্ত, ক্যাশ বই যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা এবং ব্যাংক লেনদেনসহ বিভিন্ন আয়-ব্যয়ের তথ্য ক্যাশ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত না করার অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া কমিটির অনুমোদন ছাড়া শিক্ষকদের বেতনের স্কুল অংশের টাকা বন্ধ করে দেওয়া, অনুমোদন ছাড়া সাদা কাগজে বাড়িভাড়া ভাতা গ্রহণ, সমিতি থেকে প্রশ্নপত্র কিনে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা নেওয়া এবং সহকারী শিক্ষক মোসা. সেলিনা আক্তারের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অশালীন ও আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয়ের সামনে অবস্থিত একটি হোটেল ব্যবহারের জন্য হোটেল মালিক মো. জামাল মুন্সীর কাছে বিদ্যালয়ের তিনটি বেঞ্চ ও একটি টেবিল ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কয়েকজন সহকারী শিক্ষকের লিখিত অভিযোগের পর গত ১৬ আগস্ট ইউএনও বিদ্যালয়ে গিয়ে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করেন। এর দুই দিন পর, ১৮ আগস্ট শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষকের অপসারণের দাবিতে উপজেলা কমপ্লেক্সে গিয়ে অবস্থান নেয়। পরে প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
গত ১৩ সেপ্টেম্বরের শোকজ নোটিশে প্রধান শিক্ষককে অভিযোগগুলোর বিষয়ে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নিতে চান কি না, তাও জানাতে বলা হয়। নির্ধারিত সময়ে জবাব না দিলে বা জবাব সন্তোষজনক না হলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় বলে শিক্ষার্থীদের ভাষ্য। পরে তারা বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ভাণ্ডারিয়া থানায় যায়।
পুলিশের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার পর তারা বিদ্যালয়ে ফিরে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে লিয়াকত মার্কেট ও নতুন হাইওয়ে সড়ক প্রদক্ষিণ করে ভাণ্ডারিয়া ওভারব্রিজের পশ্চিম পাশে মহাসড়কে অবস্থান নেয়। এ সময় প্রধান শিক্ষকের অপসারণের দাবিতে স্লোগান দেয় শিক্ষার্থীরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।
ঘটনার সময় ইউএনও মো. হাসিবুল হাসান সরকারি কাজে পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ছিলেন। তিনি মোবাইল ফোনে তাঁর প্রতিনিধির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে তাঁর অনুরোধে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে বিদ্যালয়ে ফিরে যায়। বিকেল ৪টার দিকে ইউএনও নিজে বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি তাদের রোববার থেকে নিয়মিত ক্লাসে ফেরার অনুরোধ করেন।
ইউএনও মো. হাসিবুল হাসান বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে শোকজ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শোকজের জবাব পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য দেওয়ার কথা জানান। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফজলুল হক মনোয়ার । নির্বাহী সম্পাদকঃ অধ্যাপক আবদুল জলিল । বার্তা সম্পাদকঃ এনামুল হক
সম্পাদনা পরিষদেঃ গোলাম মোস্তফা । সাইফুল ইসলাম নাবিল । কে এম আনোয়ার হোসেন । হাসানুল আহসান রীমন ।
প্রধান কার্যালয়ঃ সোনামুখী বাজার, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জে ।
যোগাযোগঃ ০১৮১৮-৫১৪৩১৩, ০১৭৪০-৯৯২৩২১, ০১৭১২-৩৮৫৪৪১ নম্বরে।
ইমেইলঃ badwipnews@gmail.com
সর্বস্ব সংরক্ষিত বদ্বীপ নিউজ © কপিরাইট – ২০২৬