ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ-
নারিকেল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ও বহুমুখী ব্যবহার যোগ্য ফসল। গ্রামীণ জনপদ থেকে শুরু করে শহরের বাড়ির আঙিনা-সর্বত্রই দেখা মেলে এই গাছের। নারিকেলের পানি, শাঁস, তেল ও ছোবড়া মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ সঠিক পরিচর্যার অভাবে অনেক নারিকেল গাছে ফুল ঝরে যায়, কচি ফল ঝরে পড়ে কিংবা ফল বড় হওয়ার আগেই শুকিয়ে যায়। এতে গাছের সম্ভাব্য ফলন ব্যাহত হয় এবং বাগানীরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, নারিকেলের ফল ঝরে পড়ার পেছনে পুষ্টির ঘাটতি, পানির অভাব, জলাবদ্ধতা, প্রতিকূল আবহাওয়া, অপর্যাপ্ত পরাগায়ন এবং রোগবালাইসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু সার প্রয়োগ নয়, সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে সমন্বিত পরিচর্যা নিশ্চিত করাই ফল রক্ষার কার্যকর উপায়। কেন ঝরে পড়ে নারিকেলের ফুল ও কচি ফল? নারিকেল গাছে ফুল আসার পর কিছু ফুল ও কচি ফল স্বাভাবিক নিয়মেই ঝরে পড়ে। তবে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঝরে পড়লে তা পরিচর্যার ঘাটতি বা অন্য কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
১. পানির অভাব ও অনিয়মিত সেচ: দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে এবং মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে গাছের বৃদ্ধি ও ফল ধারণ ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে খরার সময় গাছের গোড়ার মাটি অতিরিক্ত শুকিয়ে গেলে ফল ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
২. সুষম পুষ্টির অভাব: নারিকেল গাছের সুস্থ বৃদ্ধি ও ফল ধারণের জন্য নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। এসব উপাদানের ঘাটতি গাছের বৃদ্ধি ও ফলনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বোরনের ঘাটতিতে নতুন পাতার বিকৃতি এবং ফলের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।
৩. অতিরিক্ত বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা: দীর্ঘ সময় ধরে গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকলে শিকড়ে বাতাস চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে শিকড়ের কার্যক্ষমতা কমে গিয়ে গাছের পুষ্টি গ্রহণ ও বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
৪. রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ: কুঁড়ি, ফুল, ফল কিংবা শিকড়ে রোগ ও পোকার আক্রমণ হলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত অংশে পচন, ক্ষত বা অস্বাভাবিক শুকিয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
৫. প্রতিকূল আবহাওয়া ও পরাগায়নের সমস্যা: অতিরিক্ত গরম, শুষ্ক বাতাস, দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি কিংবা ফুলের স্বাভাবিক পরাগায়নে সমস্যা হলে ফল ধারণ কমতে পারে। নারিকেলের ফল রক্ষায় ৭টি কার্যকর পরামর্শ
১. বয়স অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ করুন নারিকেল গাছের ফলন বাড়াতে সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছের বয়স, মাটির উর্বরতা, জাত এবং ফলনের অবস্থা বিবেচনায় সার প্রয়োগ করতে হবে। পরিণত ফলধারী নারিকেল গাছে সাধারণত পচা গোবর বা কম্পোস্টের পাশাপাশি নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ জাতীয় সার প্রয়োজন হয়। তবে নির্দিষ্ট মাত্রা জমির অবস্থা ও গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। সার প্রয়োগের সময় গাছের কাণ্ডের একেবারে গোড়ায় সার না দিয়ে কাণ্ড থেকে কিছুটা দূরে শিকড় বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। সার প্রয়োগের পর মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে। মনে রাখবেন: বেশি সার প্রয়োগ করলেই ফলন বাড়ে না। বরং অতিরিক্ত সার গাছের ক্ষতি করতে পারে এবং উৎপাদন খরচ বাড়ায়।
২. খরার সময় নিয়মিত সেচ দিন নারিকেল গাছের শিকড় মাটি থেকে পানি ও পুষ্টি সংগ্রহ করে। দীর্ঘদিন মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে গাছের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই শুষ্ক মৌসুমে মাটির আর্দ্রতা পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে হবে। বেলে মাটিতে তুলনামূলক দ্রুত পানি শুকিয়ে যায়; অন্যদিকে এঁটেল মাটিতে পানি বেশি সময় ধরে থাকতে পারে। সেচের ব্যবধান নির্ধারণে মাটির ধরন বিবেচনা করা জরুরি। তবে অতিরিক্ত সেচ দিয়ে গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
৩. মালচিং করে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখুন নারিকেল গাছের গোড়ার চারপাশে শুকনো পাতা, ঘাস বা উপযুক্ত জৈব উপাদান দিয়ে মালচিং করলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। এতে আগাছার বৃদ্ধিও কমতে পারে এবং জৈব উপাদান পচে মাটির গুণাগুণ উন্নত হয়। মালচ কাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। এতে কাণ্ডের গোড়ায় অতিরিক্ত আর্দ্রতা জমে রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৪. বোরনসহ অণুপুষ্টির ঘাটতি শনাক্ত করুন নারিকেল গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফল গঠনে অণুপুষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বোরনের ঘাটতি দেখা দিলে নতুন পাতায় বিকৃতি, পাতার স্বাভাবিক প্রসারণে সমস্যা এবং ফলের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। তবে শুধু কচি ফল ঝরে পড়ছে বলেই বোরনের ঘাটতি হয়েছে-এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। একই ধরনের লক্ষণ অন্য কারণেও দেখা দিতে পারে। সম্ভব হলে মাটি ও গাছের পুষ্টি পরীক্ষা করে অথবা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টি প্রয়োগ করতে হবে। বোরনের ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত বোরন প্রয়োগ করলে গাছ বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে।
৫. রোগ ও পোকামাকড় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন নারিকেল গাছে ফল রক্ষার জন্য রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি। কাণ্ডে ছিদ্র, করাতের গুঁড়ার মতো ময়লা, পাতায় বড় কাটা দাগ, কচি ফলের পচন কিংবা কুঁড়ি শুকিয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। নারিকেলে গণ্ডার পোকা ও লাল পাম উইভিলের মতো ক্ষতিকর পোকা আক্রমণ করতে পারে। এসব পোকার আক্রমণে গাছের শীর্ষ অংশ ও কাণ্ড মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আক্রান্ত গাছের লক্ষণ দেখে পোকা শনাক্ত করতে হবে। এরপর আক্রান্ত অংশ ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহারের বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে। রোগ বা পোকা শনাক্ত না করে নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ করা উচিত নয়।
৬. পানি নিষ্কাশন ও মাটির পরিচর্যা নিশ্চিত করুন নারিকেল গাছের শিকড়ের সুস্থ বিকাশের জন্য মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতার পাশাপাশি বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। জে/এ
ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ, কৃষি লেখক, কথক-বাংলাদেশ বেতার, EX. সিনিয়র শিক্ষক ও পরীক্ষক (কৃষি)
কেন্দ্রীয় সভাপতি-বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন।

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফজলুল হক মনোয়ার । নির্বাহী সম্পাদকঃ অধ্যাপক আবদুল জলিল । বার্তা সম্পাদকঃ এনামুল হক
সম্পাদনা পরিষদেঃ গোলাম মোস্তফা । সাইফুল ইসলাম নাবিল । কে এম আনোয়ার হোসেন । হাসানুল আহসান রীমন ।
প্রধান কার্যালয়ঃ সোনামুখী বাজার, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জে ।
যোগাযোগঃ ০১৮১৮-৫১৪৩১৩, ০১৭৪০-৯৯২৩২১, ০১৭১২-৩৮৫৪৪১ নম্বরে।
ইমেইলঃ badwipnews@gmail.com
সর্বস্ব সংরক্ষিত বদ্বীপ নিউজ © কপিরাইট – ২০২৬