ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ-
বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় রেলপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ, নিরাপদ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী মাধ্যম। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারিবারিক প্রয়োজনে ট্রেনে যাতায়াত করেন। বিশেষ করে ঈদ, পূজা, সাপ্তাহিক ছুটি ও বিভিন্ন উৎসবের সময় ট্রেনের টিকিটের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। আর এই বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে একটি অসাধু চক্র টিকিট কালোবাজারির মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করে। অনলাইনে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরও বিভিন্ন সময়ে টিকিট সংগ্রহে ভোগান্তি, কৃত্রিম সংকট, অতিরিক্ত দামে টিকিট বিক্রি এবং প্রতারণার অভিযোগ দেখা যায়। ফলে প্রকৃত যাত্রীরা টিকিট না পেয়ে বিপাকে পড়েন। অন্য দিকে একটি চক্র নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে টিকিট বিক্রি করে। এটি শুধু অনৈতিক ব্যবসা নয়, বরং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অধিকার ও ভোক্তা স্বার্থের পরিপন্থী।
টিকোট কালোবাজারির পেছনে যেসব কারণ: ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত চাহিদা, সীমিত আসনসংখ্যা, টিকিট সংগ্রহে অসাধু সিন্ডিকেটের তৎপরতা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার। কখনো একাধিক পরিচয় বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টিকিট সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বেশি দামে টিকিট বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে যাত্রীদের প্রতারণা করা হয়। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীদের অসচেতনতা, দালালের ওপর নির্ভরশীলতা এবং অভিযোগ না করার প্রবণতা কালোবাজারিদের উৎসাহিত করে। মনে রাখতে হবে, চাহিদার সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা এবং অতিরিক্ত মূল্যে টিকিট বিক্রি করা একটি জনস্বার্থ বিরোধী কর্মকাণ্ড। কালোবাজারি প্রতিরোধে নাগরিক পর্যায়ে করণীয় টিকিট কালোবাজারি বন্ধে নাগরিকদের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
১. নির্ধারিত মাধ্যম থেকে টিকিট সংগ্রহ: যাত্রীরা বাংলাদেশ রেলওয়ের অনুমোদিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, রেলওয়ের নির্ধারিত কাউন্টার ও স্বীকৃত বিক্রয় মাধ্যম থেকে টিকিট সংগ্রহ করবেন। অপরিচিত ব্যক্তি বা অননুমোদিত ওয়েবসাইট থেকে টিকিট কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে।
২. অতিরিক্ত দামে টিকিট না কেনা: কোনো ব্যক্তি বা চক্র নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে টিকিট বিক্রির প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। জরুরি যাত্রার অজুহাতে বেশি দাম দিয়ে টিকিট কেনা কালোবাজারির চাহিদা বাড়ায়। ক্রেতা হিসেবে নাগরিকদের এ বিষয়ে আপসহীন হতে হবে।
৩. দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বর্জন: স্টেশন, কাউন্টার কিংবা অনলাইনে টিকিট পাইয়ে দেওয়ার নামে কোনো ব্যক্তি অর্থ দাবি করলে তার সহযোগিতা নেওয়া যাবে না। টিকিট সংগ্রহে দালালের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।
৪. প্রতারণার তথ্য সংরক্ষণ ও অভিযোগ: কেউ অতিরিক্ত দামে টিকিট বিক্রি করলে বা প্রতারণার চেষ্টা করলে সম্ভব হলে তার বিজ্ঞাপন, মোবাইল নম্বর, লেনদেনের তথ্য, কথোপকথন ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। এরপর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা কিংবা জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে।
৫. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সতর্কতা: ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টিকিট বিক্রির নামে প্রতারণামূলক পোস্ট ও বিজ্ঞাপন সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। যাচাই ছাড়া কোনো পোস্ট শেয়ার করা কিংবা অপরিচিত ব্যক্তিকে অগ্রিম টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
৬. ব্যক্তিগত পরিচয় ও টিকিটের তথ্যের সুরক্ষা:
টিকিট কেনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, ওটিপি ও ব্যক্তিগত তথ্য অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে টিকিট সংগ্রহ কিংবা টিকিট কেনাবেচায় সহযোগিতা করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
৭. সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে টিকিট কালোবাজারির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। কেউ কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে সামাজিকভাবে প্রশ্রয় না দিয়ে আইনসম্মত উপায়ে প্রতিরোধ করতে হবে। প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন জবাবদিহি টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধে বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট বিক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদার, অস্বাভাবিক টিকিট ক্রয় শনাক্তকরণ, যাত্রীদের পরিচয় যাচাই এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে স্টেশন ও টিকিট কাউন্টার এলাকায় নিয়মিত তদারকি, কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে নাগরিক অভিযোগ গ্রহণের জন্য সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
টিকেট কালোবাজারি রোধে গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনের ভূমিকা: টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং অনিয়মের তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে জনমত গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ ও প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে অনলাইন প্রতারণা ও টিকিট কালোবাজারির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ তৈরি হয়। ট্রেনের টিকিট কোনো অসাধু চক্রের মুনাফা অর্জনের পণ্য হতে পারে না। এটি সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজনীয় সেবা। তাই টিকিট কালোবাজারি বন্ধ দায়িত্ব শুধু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার নয়; প্রত্যেক নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমরা যদি দালালের মাধ্যমে টিকিট কেনা বন্ধ করি, অতিরিক্ত দাম দিতে অস্বীকৃতি জানাই, প্রতারণার তথ্য কর্তৃপক্ষকে জানাই এবং অন্যকেও সচেতন করি, তাহলে কালোবাজারিদের মুনাফার সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে। মনে রাখতে হবে, যে নাগরিক কালোবাজারির কাছ থেকে টিকিট কেনা প্রত্যাখ্যান করেন, তিনিও কালোবাজারি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সুতরাং নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও হয়রানিমুক্ত রেলযাত্রা নিশ্চিত করতে নাগরিক সচেতনতা, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং সামাজিক প্রতিরোধের সমন্বয় অপরিহার্য। আসুন, টিকিট কালোবাজারিকে না বলি, যাত্রী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতন হই এবং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব রেলসেবা গড়ে তুলতে সম্মিলিত ভূমিকা রাখি। জে/এ
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফজলুল হক মনোয়ার । নির্বাহী সম্পাদকঃ অধ্যাপক আবদুল জলিল । বার্তা সম্পাদকঃ এনামুল হক
সম্পাদনা পরিষদেঃ গোলাম মোস্তফা । সাইফুল ইসলাম নাবিল । কে এম আনোয়ার হোসেন । হাসানুল আহসান রীমন ।
প্রধান কার্যালয়ঃ সোনামুখী বাজার, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জে ।
যোগাযোগঃ ০১৮১৮-৫১৪৩১৩, ০১৭৪০-৯৯২৩২১, ০১৭১২-৩৮৫৪৪১ নম্বরে।
ইমেইলঃ badwipnews@gmail.com
সর্বস্ব সংরক্ষিত বদ্বীপ নিউজ © কপিরাইট – ২০২৬