মাকসুদুল হক, ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি-
বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর কৃষিতে ক্ষতিকর পোকামাকড় ও ইঁদুর দমনে বিষাক্ত রাসায়নিক বালাইনাশকের বিকল্প হিসেবে এক অনন্য নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে প্রকৃতির পাখিরা। ঝিনাইদহের দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠে কাদা-পানিতে একঝাঁক সাদা বকের বিচরণ কিংবা লাঙলের পেছনে পাখিদের ওড়াউড়ি কেবলই কোনো রূপসী বাংলার দৃশ্য নয়; বরং এটি কৃষকের ফসল রক্ষার এক প্রাকৃতিক ঢাল। তবে মাঠপর্যায়ে পাখির এই অবদান নিশ্চিত হলেও দিন দিন গ্রামীণ জনপদে নির্জনতা, আবাসন ও অবৈধ শিকারের কারণে চরম সংকটে পড়ছে কৃষকের এই অকৃত্রিম বন্ধুরা।
ঝিনাইদহের সোহাগপুর মাঠের ৭০ বছর বয়সী প্রবীণ ও সুশিক্ষিত কৃষক ফজলুল হক এই বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আলাপচারিতায় সমাজ সচেতন এই প্রবীণ মানুষটি জানান, "আমাদের তরুণ বয়সে মাঠে এত রাসায়নিক বিষের ব্যবহার ছিল না। তখন জমি চাষ দিলে বা সেচ দিলে হাজার হাজার বক, শালিক, ফিঙে এসে ক্ষতিকর পোকা খেয়ে মাঠ পরিষ্কার করে দিত। ওরাই ছিল আমাদের প্রাকৃতিক বালাইনাশক। কিন্তু এখন আধুনিক চাষাবাদের নামে জমিতে দেদারসে তীব্র বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আমাদের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।"
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বক, শালিক ও ফিঙের মতো পাখিরা ফসলের প্রধান শত্রু বালাই দমনে প্রধান ভূমিকা রাখে। জমি চাষ ও সেচ দেওয়ার সময় মাটির নিচ থেকে বের হওয়া ক্ষতিকর মাজরা পোকা, কাটুই পোকা, লার্ভা এবং পামরি পোকা পাখিরা নিখুঁত ভাবে বেছে খেয়ে ফেলে। পাখিরা প্রাকৃতিক ভাবে পোকা দমন করায় কৃষকদের জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না, যা চাষীদের উৎপাদন খরচ বহুলাংশে কমিয়ে দেয়। কীটনাশকমুক্ত নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে পাখিদের এই 'বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল' বা জৈবিক দমন পদ্ধতি সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব। মাঠ ধারের দূরবর্তী তালগাছ, শিমুল বা বটগাছগুলো ঐতিহাসিক ভাবেই ছিল এসব পাখিদের আদি বাসস্থান ও প্রজনন কেন্দ্র। প্রবীণ কৃষক ফজলুল হক আক্ষেপ করে বলেন, "দূরের ওই তালগাছগুলোতে বক পাখিদের বড় আবাস ভূমি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্রামে মানুষের কোলাহল বৃদ্ধি ও নির্জনতা হারিয়ে যাওয়ার কারণে পাখিরা সেখানে বাসা বাঁধতে পারছে না। বিষাক্ত পোকা খেয়ে এবং অবৈধ শিকারিদের কারণে অনেক পাখি মারাও যাচ্ছে।" দিনে খাবারের সন্ধান করলেও, রাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাখিদের এখন দূর-দূরান্তে ছুটে যেতে হচ্ছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও কিছু অসাধু শিকারি বিষটোপ বা বিভিন্ন ফাঁদ পেতে প্রতিনিয়ত পাখি নিধন করছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের ৩৮ ধারা অনুযায়ী যেকোনো দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি শিকার, হত্যা, ক্রয়-বিক্রয়, দখলে রাখা বা পরিবহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন প্রথম বারের মতো লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড অথবা ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে শাস্তি দ্বিগুণ হয়ে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড অথবা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।
কৃষি ও পরিবেশের এই অকৃত্রিম বন্ধুদের রক্ষায় সমাজ ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় ও মাঠে তাদের শিকারের সুযোগ সৃষ্টিতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। ফসলের জমিতে নিয়মিত বিরতিতে গাছের ডালপালা বা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে পাখিদের বসার জায়গা করে দিতে হবে, যেন পাখিরা সহজে বসে পোকা শিকার করতে পারে। শুধু দিনের পাখিই নয়, ফসলের বড় শত্রু ইঁদুর দমনে রাতের বেলা হুতুম পেঁচা বা অন্যান্য বড় নিশাচর পাখিরা যাতে বসতে পারে, মাঠে সেই উপযোগী মজবুত বসার ব্যবস্থা (পার্চিং) করে দিতে হবে। পেঁচার বিচরণ বাড়লে জমিতে ইঁদুরের উপদ্রব প্রাকৃতিক ভাবেই শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
এর পাশাপাশি মাঠের ধারে থাকা পুরোনো তালগাছ, শিমুল ও কড়ই গাছ কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং নতুন করে এই ধরণের গাছ রোপণ করতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু বড় গাছ বা বাগানকে স্থানীয় উদ্যোগে 'পাখিদের অভয়শ্রম' ঘোষণা করে সেখানে মানুষের অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত ও কোলাহল নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সাথে জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার কমাতে হবে, যেন পাখিদের খাদ্য শৃঙ্খল বিষাক্ত না হয়। পাখি শিকার বা বিষটোপ দিয়ে নিধন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন পরিবেশবাদীরা। ঝিনাইদহের সচেতন মহল মনে করেন, কৃষিকে সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও পরিবেশ বান্ধব করতে হলে জীব বৈচিত্র্য রক্ষা এবং পাখিদের টিকিয়ে রাখার কোনো বিকল্প নেই। প্রকৃতির এই বন্ধুদের জন্য আমাদের নিজেদের স্বার্থেই অভয় আশ্রয় গড়ে তুলতে হবে এবং যে কোনো মূল্যে পাখি নিধন বন্ধ করতে হবে। জে/এ

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফজলুল হক মনোয়ার । নির্বাহী সম্পাদকঃ অধ্যাপক আবদুল জলিল । বার্তা সম্পাদকঃ এনামুল হক
সম্পাদনা পরিষদেঃ গোলাম মোস্তফা । সাইফুল ইসলাম নাবিল । কে এম আনোয়ার হোসেন । হাসানুল আহসান রীমন ।
প্রধান কার্যালয়ঃ সোনামুখী বাজার, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জে ।
যোগাযোগঃ ০১৮১৮-৫১৪৩১৩, ০১৭৪০-৯৯২৩২১, ০১৭১২-৩৮৫৪৪১ নম্বরে।
ইমেইলঃ badwipnews@gmail.com
সর্বস্ব সংরক্ষিত বদ্বীপ নিউজ © কপিরাইট – ২০২৬