
বিধান চন্দ্র সান্যাল-
‘স্বাধীনতা’ কেবল একটি শব্দ বা তাত্ত্বিক ধারণা নয়, এটি মানব অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এবং দর্শনের ইতিহাসে স্বাধীনতার সংজ্ঞা যুগে যুগে বিবর্তিত হয়েছে। এটি যেমন রাষ্ট্র বা সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ, তেমনি তা ব্যক্তির মনন ও প্রাত্যহিক জীবনের গভীরেও প্রোথিত। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের চিন্তা থেকে শুরু করে আধুনিক গণতন্ত্রের যুগ পর্যন্ত, স্বাধীনতার ধারণাটি এক বিশাল বিস্তার লাভ করেছে। ‘স্বাধীনতা: রাজনীতি থেকে ব্যক্তিজীবন’ শীর্ষক এই প্রবন্ধে আমরা রাষ্ট্রনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে ব্যক্তিমানুষের অন্তর্জগৎ পর্যন্ত স্বাধীনতার বহুমুখী রূপ ও তার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় স্বাধীনতার প্রধান দুটি দিক রয়েছে: ‘নেতিবাচক স্বাধীনতা’ (Negative Liberty) এবং ‘ইতিবাচক স্বাধীনতা’ (Positive Liberty)। নেতিবাচক স্বাধীনতার মূল কথা হলো-বাইরের কোনো শক্তির বা রাষ্ট্রযন্ত্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ না থাকা। মানুষ যাতে তার ইচ্ছামতো কাজ করতে পারে, তার ওপর কোনো বাহ্যিক বাধা না থাকে, তা এই ধারণার লক্ষ্য। অন্য দিকে, ইতিবাচক স্বাধীনতা হলো-ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলি ও সক্ষমতার বিকাশ ঘটানোর জন্য রাষ্ট্র বা সমাজের পক্ষ থেকে অনুকূল পরিবেশ বা সুযোগ সৃষ্টি করা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আইসাইয়া বার্লিন (Isaiah Berlin) তাঁর বিখ্যাত ‘টু কনসেপ্টস অফ লিবার্টি’ (Two Concepts of Liberty) প্রবন্ধে এই দুই ধারণার বিশদ আলোচনা করেছেন।
রাজনৈতিক স্বাধীনতার মূল ভিত্তি হলো নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকেরা ভোট দেওয়ার অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, সংগঠন করার অধিকার এবং ধর্মের স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। এই অধিকারগুলো কোনো স্বৈরতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইয়ের ফসল। ফরাসি বিপ্লবের মন্ত্র ছিল ‘সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা’। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলতে মূলত শৃঙ্খলমুক্তি এবং স্বৈরাচার থেকে মুক্তিকেই বোঝানো হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। অমর্ত্য সেন-এর মতো অর্থনীতিবিদ ও চিন্তাবিদদের মতে, প্রকৃত রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা নির্ভর করে মানুষের সক্ষমতা (Capability) বৃদ্ধির ওপর। একজন দরিদ্র বা প্রান্তিক মানুষের কাছে বাকস্বাধীনতা ততটা অর্থবহ হয় না, যতটা না তার অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা থাকে। তাই রাজনীতিতে স্বাধীনতার শতরূপের মধ্যে অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায় বিচার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সমাজ জীবনে স্বাধীনতার চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক স্বাধীনতা বলতে সেই পরিবেশকে বোঝায় যেখানে কোনো ব্যক্তি বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ বা জাতিগত বৈষম্যের শিকার হন না। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের স্বাধীনতা, কিংবা বর্ণবাদী সমাজে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার রক্ষার লড়াই সামাজিক স্বাধীনতারই অংশ। লিঙ্গ বৈষম্যহীন সমাজে প্রত্যেক নারী ও পুরুষ সমান সুযোগ পাবেন, এটাই সামাজিক স্বাধীনতার মূল কথা। এছাড়া ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, যেমন-পেশা নির্বাচন, জীবন সঙ্গী নির্বাচন, কিংবা নিজের জীবনধারা বেছে নেওয়ার অধিকারও সামাজিক স্বাধীনতার আওতাভুক্ত। কোনো সমাজ যখন তার নাগরিকদের এই স্বাধীনতাগুলো প্রদান করে, তখনই সমাজ প্রগতিশীল হয়ে ওঠে। যে কোনো মুক্ত সমাজেই ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) তাঁর ‘অন লিবার্টি’ (On Liberty) গ্রন্থে ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে জোরালো সওয়াল করে ছিলেন। তিনি মত দিয়েছিলেন যে, অপরের ক্ষতি না করে একজন মানুষ তার নিজের দেহ ও মনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন। সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর কিছু যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ প্রয়োজন হলেও, সেই বিধিনিষেধ যেন ব্যক্তির মৌলিক অধিকার হরণ না করে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
স্বাধীনতা ও অর্থনীতির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে রাজনৈতিক বা সামাজিক স্বাধীনতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলতে মূলত সম্পত্তি অর্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য করা এবং জীবিকা নির্বাহের স্বাধীনতাকে বোঝায়। তবে সমাজতান্ত্রিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেবল পুঁজিপতিদের অবাধ স্বাধীনতা নয়, বরং তা হলো শোষণ থেকে মুক্তি এবং সম্পদের সুষম বণ্টন। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, বেকারত্ব থেকে মুক্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক স্বাধীনতারই বিভিন্ন রূপ। কার্ল মার্ক্সের মতে, মানুষ যখন তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়, তখনই সে প্রকৃত অর্থে নিজের সৃজনশীল বিকাশ ঘটাতে পারে। সুতরাং, বৃহৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার শতরূপের মধ্যে অর্থনৈতিক মুক্তি একটি প্রধান স্তম্ভ।
একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার ধারণাতেও এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। ডিজিটাল স্পেস বা সাইবার জগৎ আজ মানুষের মত প্রকাশের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ আজ বিশ্বজুড়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারছে এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারছে। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল যুগে তথ্য অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Privacy) এবং নজরদারি রাষ্ট্র (Surveillance State)-এর মতো বিষয়গুলো স্বাধীনতার নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ডেটা বা তথ্যের স্বাধীনতা, ভেন্ডর লক-ইন (Vendor lock-in) থেকে মুক্ত হয়ে ওপেন সোর্স প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং সাইবার বুলিং থেকে মুক্ত থাকার অধিকার-আজকের দিনে স্বাধীনতার সমার্থক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল যুগে স্বাধীনতার শতরূপ তাই শুধু ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ নয়, তা ভার্চুয়াল জগতেও সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক।
রাজনীতি, সমাজ বা অর্থনীতির গণ্ডি পেরিয়ে স্বাধীনতার চূড়ান্ত রূপটি আমরা খুঁজে পাই ব্যক্তি জীবনে এবং মানুষের মনস্তত্ত্বে। বাহ্যিক স্বাধীনতা বা অধিকার তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন একজন মানুষ মানসিক ভাবে স্বাধীন হতে পারেন। মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা (Psychological Freedom) বলতে বোঝায় নিজের চিন্তা, অনুভূতি এবং আচরণকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা। অনেক সময় রাষ্ট্র বা সমাজ স্বাধীন হলেও, ব্যক্তি মানুষ তার নিজস্ব সংস্কার, ভয়, উদ্বেগ বা কুসংস্কারের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে। জঁ-পল সার্ত্রে (Jean-Paul Sartre) বলে ছিলেন, “মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য।” তাঁর এই অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল কথা হলো, মানুষ তার নিজের কর্ম ও সিদ্ধান্তের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী। পরিস্থিতির চাপে মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করলেও, প্রতিটি পদক্ষেপে তার কাছে কোনো না কোনো বিকল্প বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকে। ব্যক্তি জীবনে স্বাধীনতার শতরূপের মধ্যে রয়েছে:
১. স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশ: কোনো বাহ্যিক চাপ বা ভয় ছাড়াই নিজের বিশ্বাস ও মতামত পোষণ করার ক্ষমতা।
২. সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা: নিজের কর্মজীবন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা জীবনযাত্রার বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
৩. আবেগীয় স্বাধীনতা: নিজের আবেগ ও অনুভূতিকে দমন না করে তা সুস্থভাবে প্রকাশ করতে পারা এবং অন্যের মতামতের অতিরিক্ত দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া।
স্বাধীনতা কখনোই স্বেচ্ছাচারিতা বা উচ্ছৃঙ্খলতা নয়। দার্শনিকদের মতে, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ (Responsibility) ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant) মনে করতেন, প্রকৃত স্বাধীনতা হলো নৈতিক স্বাধীনতার চর্চা। মানুষ যখন যুক্তি দ্বারা পরিচালিত হয় এবং নিজের নৈতিক দায়িত্ব পালন করে, তখনই সে স্বাধীন। আমেরিকান রাষ্ট্রনায়ক থমাস জেফারসন বলেছিলেন, নাগরিকের নৈতিক চরিত্র ও সততার ওপরই স্বাধীনতার স্থায়িত্ব নির্ভর করে। সমাজ বা রাষ্ট্রে বসবাস করার সময় একজন ব্যক্তি যেমন তার স্বাধীনতার দাবি করেন, তেমনি অপর একজন মানুষের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাও তার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের অপব্যবহার না করে, সমাজের প্রতিটি স্তরে সাম্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা স্বাধীনতারই অন্যতম শর্ত। স্বাধীনতা একটি স্থির বা অপরিবর্তনীয় ধারণা নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে, তা সে ফরাসি বিপ্লব হোক, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম হোক বা নাগরিক অধিকার আন্দোলন হোক, মানুষ সর্বদা স্বাধীনতার নতুন রূপ আবিষ্কার করেছে এবং তার জন্য লড়াই করেছে। বৃহৎ অর্থে, স্বাধীনতা হলো সেই প্রশস্ত পরিসর, যা মানুষকে তার পূর্ণ সম্ভাবনায় বিকশিত হতে সাহায্য করে। রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আমাদের প্রাত্যহিক ব্যক্তিজীবন পর্যন্ত-স্বাধীনতার শতরূপ আমাদের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। রাষ্ট্র নৈতিক স্বাধীনতা যেমন আমাদের অধিকার রক্ষা করে, তেমনি মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আমাদের আত্মোপলব্ধি ও সৃজনশীলতার পথ উন্মুক্ত করে। তবে স্বাধীনতা যেন কেবল অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা যেন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধের মেলবন্ধনে এক সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, স্বাধীনতার শতরূপের সার্থকতা তখনই প্রমাণিত হয়, যখন একজন নাগরিক শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাবে মুক্ত নন, বরং তিনি তার ব্যক্তি জীবনেও প্রকৃত অর্থে নির্ভীক ও স্বাবলম্বী।
তথ্যসূত্র-১. আইসাইয়া বার্লিন রচিত “টু কনসেপ্ট অফ লিবার্টি”
২. জন স্টুয়ার্ট মিল রচিত “অন লিবার্টি”