
রিয়াজুল হক সাগর, রংপুর।
তিস্তা নদীর ভাঙনে বসতভিটা হারানো কয়েকটি পরিবারের ঘর নির্মাণের জন্য জমি ভরাট করতে নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। এ জন্য ৫ শতক জায়গা ভরাটের মৌখিক অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে স্থানীয়দের দাবি, এরই মধ্যে প্রায় ২০ শতক জমি ভরাট করা হয়েছে এবং আরও ৩৫ শতক জমি ভরাটের প্রক্রিয়া চলছিল। সব মিলিয়ে ৫৫ শতক জমি ভরাটের পরিকল্পনা ছিল বলে তারা জানান। এ ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগের পর অভিযান চালিয়ে একটি ড্রেজার মেশিন, পাইপসহ বালু উত্তোলনের বিভিন্ন সরঞ্জাম নষ্ট করেছে উপজেলা প্রশাসন। ঘটনাটি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৈয়বখাঁ এলাকায়। সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলের দিকে তৈয়বখাঁ এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করেন রাজারহাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সামিউর রহমান। স্থানীয় সূত্র জানায়, অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে সংশ্লিষ্টরা সরে যান বলে স্থানীয়দের দাবি। পরে ঘটনাস্থলে থাকা একটি ড্রেজার মেশিন, বালু উত্তোলনের পাইপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নষ্ট করে দেওয়া হয়। এ সময় আরেকটি ড্রেজার নৌকায় করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও সরেজমিনে জানা যায়, গত ২৩ আগস্ট তৈয়বখাঁ এলাকায় তিস্তা নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে বসতভিটার জমি ভরাটের কাজ শুরু হয়। তিস্তার ভাঙনে বসতভিটা হারানো কয়েকটি পরিবার ঘর নির্মাণের জন্য জমি ভরাট করছিল বলে স্থানীয়রা জানান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অপিয়াল নামে এক ব্যক্তির প্রায় ২৫ শতক, শরীফ মিয়ার ১৫ শতক এবং আব্দুল খালেকের ১৫ শতক জমি ভরাটের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। এসব জমিতে কয়েকটি বসতবাড়ি নির্মাণের কথা ছিল। নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু তুলে পাইপের সাহায্যে সরাসরি নির্ধারিত জমিতে ফেলা হচ্ছিল। কাজ শুরুর সময় নির্ধারিত জায়গা ভরাট করতে প্রায় ১০ দিন সময় লাগবে বলে জানানো হলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক মাস পরও বালু উত্তোলন ও জমি ভরাটের কার্যক্রম চলছিল। বালু উত্তোলনের অনুমতির বিষয়ে বেলাল হোসেন নামে এক ব্যক্তি দাবি করেন, কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ প্রায় এক থেকে দেড় মাস আগে তিস্তা নদীর বালু দিয়ে ৫ শতক জায়গা ভরাটের মৌখিক অনুমতি দিয়েছিলেন। তার দাবি, তিস্তার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বসতভিটা পুনর্গঠনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই ওই অনুমতির কথা বলা হয়েছিল। এ বিষয়ে সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ এবং আলহাজ্ব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ জানান, তিস্তা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ৫ শতক জায়গা ভরাটের জন্য মৌখিকভাবে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওই অনুমতির বিপরীতে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ শতক জমি ভরাট করা হয়েছে। এরপর আরও ৩৫ শতক জমি ভরাটের প্রক্রিয়া চলছিল। ফলে মোট ৫৫ শতক জমি ভরাটের পরিকল্পনা ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। এতে প্রশ্ন উঠেছে, ৫ শতক জায়গা ভরাটের মৌখিক অনুমতির বিপরীতে কীভাবে ২০ শতক জমি ভরাট করা হলো এবং আরও ৩৫ শতক জমি ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হলো। তৈয়বখাঁ এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যে গত ২০ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বালু উত্তোলনের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনায় আসে এবং প্রশাসনের নজরে যায়। পরদিনই ঘটনাস্থলে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। স্থানীয়রা বলছেন, তিস্তা নদীর ভাঙনে বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর পুনর্বাসন জরুরি। তাদের ঘর নির্মাণের জন্য জমি ভরাটের প্রয়োজন হলে প্রশাসনের সমন্বয়ে বৈধ ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে নদী থেকে বালু উত্তোলন ও জমি ভরাটের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও বিধিবিধান মানা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। এদিকে প্রশাসনের অভিযানের পর তৈয়বখাঁ এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। তবে ৫ শতকের মৌখিক অনুমতির বিপরীতে ২০ শতক জমি ভরাট এবং আরও ৩৫ শতক জমি ভরাটের প্রক্রিয়ায় থাকার বিষয়টি কীভাবে ঘটল, মোট ৫৫ শতক ভরাটের পরিকল্পনা কীভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং নদী থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিধিবদ্ধ কোনো অনুমোদন ছিল কি না-এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।