
এমএফএইচ রাজু | ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টা থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এ সময় ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে নদী, মোহনা ও নির্ধারিত জলসীমায় মাছ আহরণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ থাকবে।
নিষেধাজ্ঞাকালে পিরোজপুরসহ দেশের ২০ জেলার নদী ও মোহনায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ও নিষিদ্ধ থাকবে। ফলে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন নদী ও মোহনায় মাছ ধরতে পারবেন না সংশ্লিষ্ট এলাকার জেলেরা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২৩ আশ্বিন থেকে ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত মোট ২২ দিনকে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়ে মা ইলিশ যাতে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারে, সে লক্ষ্যেই প্রতিবছরের মতো এবারও এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় দেশের ২০ জেলার নদী ও মোহনায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো, মানিকগঞ্জ, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, ঢাকা, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও মুন্সিগঞ্জ।
এর ফলে পিরোজপুরের বিভিন্ন নদী ও মোহনা, বিশেষ করে কচা নদীসহ সংশ্লিষ্ট জলাঞ্চলে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশের পাশাপাশি অন্যান্য মাছ আহরণও বন্ধ থাকবে।
অন্যদিকে আরও ১৮ জেলার নদীতে এ সময়ে শুধু ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমায় ইলিশসহ সব প্রজাতির মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দীর্ঘ ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় জেলেদের জীবিকা নির্বাহে সরকার ভিজিএফের আওতায় খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৮ জেলার ১৬৮ উপজেলার ৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৯০টি জেলে পরিবার এ সহায়তার আওতায় রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জেলেদের সচেতন করতে সভা, প্রচার, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য, আইন ও এর সুফল সম্পর্কে জেলেদের অবহিত করার পাশাপাশি সরকারি সহায়তার বিষয়টিও জানানো হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ও সফল করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, নৌ পুলিশ ও কোস্ট গার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নদী, মোহনা ও সমুদ্র এলাকায় নিয়মিত নজরদারি এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা নয় বরং ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশকে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। এ সময় মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে পরবর্তী সময়ে নদী ও সাগরে ইলিশের প্রজনন বাড়বে এবং এর সুফল জেলে, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সবাই পাবেন।
এদিকে নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার আগে বরিশাল অঞ্চলের বাজারগুলোতে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। নিষেধাজ্ঞার আগে শেষ সময়ে অনেকে ইলিশ কিনে সংরক্ষণ করছেন বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর ইলিশের পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ থাকায় এ সময় কেউ অবৈধভাবে ইলিশ সংরক্ষণ বা বিক্রির চেষ্টা করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ইলিশ বাংলাদেশের অর্থনীতি, মৎস্যজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা করা গেলে নদী ও সাগরে নতুন প্রজন্মের ইলিশের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
মৎস্য সংশ্লিষ্টদের মতে, নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং জেলেদের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে মা ইলিশ রক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়বে। এতে একদিকে জেলেদের আয় ও জীবিকার সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে দেশের মানুষের জন্য রুপালি ইলিশের সরবরাহও আরও স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তাই ইলিশের প্রজনন মৌসুমে সরকারের দেওয়া ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে জেলে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।