গগন হরকরা: জাতীয় সংগীতের উৎসভূমি

[print_bangla]

মাকসুদুল হক, ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ

আজ ৯ই অক্টোবর, বিশ্ব ডাক দিবস। এই বিশেষ দিনে আমাদের ফিরে যেতে হবে উনিশ শতকের শেষলগ্নে, শিলাইদহের পদ্মাপাড়ে। যেখানে ইতিহাসের এক পরম সন্ধিক্ষণে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন দুই ভিন্ন গোলার্ধের মানুষ—একদিকে কলকাতার ধনাঢ্য পরিবারের তরুণ জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর অন্যদিকে লালন সাঁইজির মুরিদ, প্রবীণ ডাকপিয়ন তথা পোস্টমাস্টার গগনচন্দ্র দাম, যিনি ইতিহাসে ‘গগন হরকরা’ নামে অমর হয়ে আছেন।
১৮৮৯-৯০ সালের দিকে শান্ত সন্ধ্যায় পদ্মার বুকে নোঙর করে থাকা জমিদারের বোট ‘পদ্মা’-র কাছ দিয়ে আপন মনে গেয়ে যাচ্ছিলেন গগন হরকরা—“আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে…”। পদ্মার শান্ত জলের বুক চিরে আসা সেই মরমী সুর রবীন্দ্রনাথকে আলোড়িত করেছিল। কলকাতার নাগরিক আভিজাত্য বা উপনিষদের নিরাকার ব্রহ্মের ধারণা যা দিতে পারেনি, কসবা গ্রামের এক ডাকপিয়ন তাঁর একতারার সহজ সুর দিয়ে তা কবির মনের গভীরে গেঁথে দিলেন। গগনের এই ‘মনের মানুষ’-এর ধারণাই পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের কাব্যদর্শনে ‘জীবনদেবতা’ ও ‘মানুষের ধর্ম’ (The Religion of Man) হিসেবে পূর্ণতা পায়।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই ১৩২২ বঙ্গাব্দের ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ‘হারামণি’ বিভাগের সূচনায় গগনের এই গানটি প্রকাশ করে লিখেছিলেন, “কথা নিতান্ত সহজ, কিন্তু সুরের মূর্চ্ছনায় এর অর্থ অপূর্ব জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।” এমনকি ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সভায় বিশ্বকবি গগন হরকরার নাম পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, গগনের এই নিভৃত জীবন ও আধ্যাত্মিক ডাক বিলির পেশা রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত রূপক নাটক ‘ডাকঘর’ (১৯১২)-এর বালক অমল চরিত্রের অন্যতম বড় মনস্তাত্ত্বিক অনুপ্রেরণা ছিল।
গগনের বাউল সুরের ঋণ কবিগুরু কোনোদিন ভোলেননি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক রাগ-সংগীতের ব্যাকরণ সরিয়ে রেখে গগন হরকরার এই গানের অবিকল সুরে বেঁধেছিলেন—”আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”, যা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌম জাতীয় সংগীত।
লালন সাঁইজির সরাসরি সান্নিধ্য পাওয়া এই মহান সুরকার ১৯১০ সালের ১২ আগস্ট প্রয়াণ বরণ করেন। গগন হরকরার স্মৃতি রক্ষার্থে কুষ্টিয়া পৌরসভার উদ্যোগে শহরের হাউজিং নিশান মোড়ে পিতল দিয়ে তাঁর একটি দৃষ্টিনন্দন স্মারক ভাস্কর্য গড়ে তোলা হয়েছিল। মাথায় পাগড়ি, পরনে ধুতি, এক হাতে আলো ছড়ানো হারিকেন আর অন্য হাতে ঘণ্টার বল্লম নিয়ে ছুটে চলা সেই প্রতিমূর্তি আজ চরম অবহেলার শিকার। রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কিছু অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারী ভাস্কর্যটির হাত থেকে খুলে নিয়ে গেছে পিতলের তৈরি প্রতীকী হারিকেন আর নিরাপত্তার একমাত্র ভরসা ধাতব বল্লমটি। চুরির পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা আর পুনরায় স্থাপন করা হয়নি। আজ নিশান মোড়ের সেই গগন হরকরা তাঁর হারিকেন আর বল্লমহীন শূন্য এক হাত বাড়িয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন।
বিশ্ব ডাক দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে, হারিয়ে যাওয়া সেই হারিকেন ও বল্লভ পুনঃস্থাপন করে নিশান মোড়ের এই ভাস্কর্যটির যথাযথ সংস্কার এবং নতুন প্রজন্মের অন্তরে জাতীয় সংগীতের সুরের এই আদি কারিগরের স্মৃতিকে প্রদীপ্ত রাখা আজ সময়ের পরম দাবি।

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গগন হরকরা: জাতীয় সংগীতের উৎসভূমি

০৯ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top