বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি:
কুশিয়ারা নদীর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। অনিয়ন্ত্রিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশ ক্রমশ ভেঙে যাচ্ছে। এর ফলে নদীর নাব্যতা কমছে, নদীর তির ধসে যাচ্ছে, এবং বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ভূমিক্ষয়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। কুশিয়ারা নদী থেকে অবৈধ বালু তোলা বন্ধে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না। কারণ অবৈধ বালু তোলার পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী চক্র। এই চক্রের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেকে। তাঁরা অবৈধ বালু তোলার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
নদী থেকে অবৈধ বালু তোলা বন্ধে সরকারের পাশাপাশি জনগণের সচেতনতাও জরুরি। অবৈধ বালু তোলার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। অবৈধ বালু তোলার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে।
নদীতে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য কঠোর লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। অবৈধ বালু তোলার বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। অবৈধ বালু তোলার পেছনে থাকা চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অবৈধ বালু তোলার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। নদী থেকে অবৈধ বালু তোলা বন্ধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
এদিকে বিয়ানীবাজার উপজেলার শেওলা ইউনিয়নে কুশিয়ারা নদী থেকে অবৈধভাবে এবং ইজারা বহির্ভূত জায়গা থেকে প্রকাশ্যেই চলছে বালি উত্তোলনের মহোৎসব। নির্বিচারে বালি লুটের ফলে নদীর পাড় ভেঙে হুমকিতে পড়েছে স্থানীয় ফসলি জমি, বসতবাড়ি, মসজিদ ও কবরস্থান। এই পরিস্থিতিতে তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে বালি উত্তোলন বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঘটনার বিবরণ ও অবরুদ্ধ ড্রেজার:
জানা গেছে, শেওলা ইউনিয়নের কুশিয়ারা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে বিশেষ করে ১ ও ২ নং ওয়ার্ড এবং দীগলবাক এলাকায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। সম্প্রতি শেওলায় ইজারা বহির্ভূত জায়গা থেকে বালি উত্তোলনের অভিযোগে একটি ড্রেজার এবং এর সাথে থাকা শ্রমিকদের অবরুদ্ধ করেন বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তবে ইজারাদারের দাবি, স্থানীয় কিছু যুবকই তাদের এই ড্রেজারটি সেখানে নিয়ে এসেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি ভয়েস রেকর্ডও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হয়েছে।এলাকাবাসীর প্রতিবাদ ও আলটিমেটাম:
এর আগে বালি উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধের দাবিতে শেওলা ইউনিয়নে জরুরী সভা ও মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ড্রেজার দিয়ে অনবরত বালি তোলার কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে এবং তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনকে (ইউএনও) জানানো হলেও স্থায়ী কোনো সুরাহা মেলেনি। বালি উত্তোলন বন্ধ না হলে আগামীতে আরও কঠোর কর্মসূচির আলটিমেটাম দিয়েছেন এলাকাবাসী।
নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন (বালুদস্যুতা) বাংলাদেশের একটি ভয়াবহ সমস্যা, যা প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষকে ভিটেমাটিহীন, নিঃস্ব এবং অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আইন অমান্য করে ড্রেজার বসিয়ে অনিয়ন্ত্রিত বালু তোলার ফলে নদীপাড়ের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে মানুষের যে চরম ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তার মূল কারণ ও প্রভাবগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নদীভাঙন ও ভিটেমাটি বিলীন
- আবাসস্থল ধ্বংস: বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ গভীর ও অসম হয়ে যায়। এর ফলে তীব্র স্রোতের সৃষ্টি হয় এবং পাড় ভেঙে মানুষের বসতভিটা, ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
- উদ্বাস্তু হওয়া: বহু পরিবার রাতারাতি তাদের পৈতৃক ভিটা হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছে এবং খোলা আকাশের নিচে বা বাঁধে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।
২. আবাদী জমি ও ফসল নষ্ট
- কৃষিজমি গ্রাস: নদীর অববাহিকায় থাকা শত শত একর উর্বর ফসলি জমি নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে।
- জীবিকা চ্যুতি: কৃষকরা তাদের আয়ের একমাত্র উৎস হারিয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছেন, যা তাদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
৩. সরকারি ও সামাজিক অবকাঠামো ধ্বংস
- স্থাপনা ধস: কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেড়িবাঁধ, সেতু, কালভার্ট, রাস্তাঘাট, স্কুল এবং মসজিদ-মাদরাসা ধসে পড়ছে।
- যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: রাস্তা ও সেতু ভেঙে যাওয়ায় পুরো এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
৪. পরিবেশগত বিপর্যয় ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতি
- জীববৈচিত্র্য ধ্বংস: নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হয় এবং মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে জেলে সম্প্রদায়ের ওপর।
প্রতিকারের উপায় ও আইনী ব্যবস্থা
বাংলাদেশে ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের অনুমতি এবং নির্দিষ্ট বালুমহাল ছাড়া যেকোনো স্থান থেকে বালু তোলা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। এই জুলুম থেকে মানুষকে বাঁচাতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
- প্রশাসনের কঠোর নজরদারি: স্থানীয় প্রশাসন ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অবৈধ ড্রেজার জব্দ ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া।
- জনসচেতনতা ও প্রতিরোধ: ভুক্তভোগী এলাকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ জানাতে হবে।
- স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ: ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে সিসি ব্লক বা জিওব্যাগ দিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা।
নদী ভাঙনের হাত থেকে নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ রক্ষার্থে বালি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন বিয়ানীবাজার উপজেলার শেওলা ইউনিয়নের স্থানীয় ১ নং ও ২নং ওয়ার্ডের ভুক্তভোগী বাসিন্দারা ।