
এমএফএইচ রাজু | ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলায় এক গৃহবধূর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় স্বামী লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে তিনি স্ত্রীকে আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি করেছেন। একই সঙ্গে স্ত্রীর সঙ্গে এক ফ্রান্সপ্রবাসীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, বিপুল অর্থ লেনদেন এবং একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহারের অভিযোগও তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন।
অভিযোগকারী মো. রেজাউল হক (৩০) বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার পুটিখালী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি জানান, ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক নিবন্ধিত কাবিনের মাধ্যমে মোসা. ফাহিমা আক্তার (তানিয়া)-এর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তারা পিরোজপুর সদর উপজেলার খুমুরিয়া এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
রেজাউল হকের দাবি, সংসার চলাকালে তিনি জানতে পারেন, তার স্ত্রীর সঙ্গে সিলেটের এক ফ্রান্সপ্রবাসীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এছাড়া, বিয়ের আগে ফাহিমার আরেকটি বিয়ে হয়েছিল এবং ওই সংসারে তার দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। এসব তথ্য তার কাছে গোপন রাখা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৫ জুন বিকেলে ফাহিমা ভান্ডারিয়া উপজেলার ধাওয়া ইউনিয়নে তার ছোট বোনের বাড়িতে যান। খবর পেয়ে রেজাউল হক রাতেই সেখানে পৌঁছে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তবে রাতের একপর্যায়ে তাকে আর সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে তিনি জানতে পারেন, কয়েকজন আত্মীয়ের সহায়তায় তাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে তিনি তার শ্যালিকা, শাশুড়িসহ কয়েকজনকে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, পরিকল্পিতভাবে তাকে হয়রানি এবং ভবিষ্যতে আইনি জটিলতায় ফেলার উদ্দেশ্যেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
রেজাউল হক বলেন, সিলেটের ফ্রান্সপ্রবাসী মো. আবু মিয়া নিজেকে আমার স্ত্রী ফাহিমার স্বামী বলে দাবি করে আসছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি গোপনে টাকা পাঠাতেন এবং বিভিন্নভাবে কুপরামর্শ দিয়ে আমাদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন। আমার কাছে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, অডিও-ভিডিও রেকর্ড এবং বিভিন্ন নথিপত্র রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা চাইলে আমি সেগুলো উপস্থাপন করতে প্রস্তুত।
তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার দিন তার স্ত্রী বাসা থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে বের হন। পরে ছোট বোনের বাড়িতে তাকে দেখা গেলেও কিছু সময় পর তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। একই সময়ে অভিযোগে উল্লেখিত এক যুবকও সেখান থেকে চলে যাওয়ায় তিনি তাদের একসঙ্গে অন্যত্র চলে যাওয়ার সন্দেহ প্রকাশ করেন।
রেজাউল হকের অভিযোগ, ঘটনার পর কারিমা আক্তার ও তার স্বামী মামুন শিকদারের সহযোগিতায় ফাহিমা আক্তার ইমরান হাওলাদারের সঙ্গে অন্যত্র চলে যান। পরবর্তীতে ইমরানের বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি বলেও তিনি দাবি করেন। এ ঘটনায় তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে কারিমা আক্তারের শ্বশুর আ. খালেক শিকদার বলেন, রেজাউল হক তার বাড়িতে এসে নিজের পরিচয় দেন। পরে ফাহিমার সঙ্গে কথা বলতে গেলে কিছুক্ষণ পর তাকে আর সেখানে দেখা যায়নি। একই সময়ে ইমরানও চলে যান বলে তিনি দাবি করেন। এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তারা রেজাউল হক ও রাশিদা বেগমকে আশ্রয় দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তার পুত্রবধূ কারিমা আক্তার ফাহিমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য রেজাউলকে চাপ দেয়। অন্যথায় তাকে গুমের মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
আ. খালেক শিকদার আরও বলেন, তার ছেলে মিরাজ শিকদার ফাহিমাকে তালাক দেওয়ার পর থেকেই ফাহিমা ও কারিমা তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। এখনো সেসব মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে প্রশাসনের প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অভিযুক্ত কারিমা আক্তার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অভিযুক্ত মামুন শিকদার বলেন, ঘটনার সময় তিনি কর্মস্থল ঢাকায় ছিলেন। বাড়িতে একজন অপরিচিত ব্যক্তি এসেছিলেন বলে তার স্ত্রী ফোনে জানিয়েছিলেন। তবে এরপর কী ঘটেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
রাশিদা বেগম বলেন, আমি আগেই মেয়ের বাড়িতে ছিলাম। ফাহিমা হঠাৎ সেখানে আসে। আমি তাকে স্বামীর সংসারে ফিরে যেতে বলেছিলাম। পরে কীভাবে সে চলে গেছে, তা আমার জানা নেই। তিনি জানান, কারিমাও তাকে ঘর থেকে চলে যেতে বলেছিলেন। পরে কোথায় থাকবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি রেজাউল হককে সঙ্গে নিয়ে তার বেয়াই আ. খালেক শিকদারের বাড়িতে থাকার ইচ্ছার কথা জানান।
এদিকে, ফ্রান্সপ্রবাসী মো. আবু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ভান্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান জানান, লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লিখিত অভিযোগ ও বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের দাবি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত বলে গণ্য করা যাবে না।