
হৃদয় রায়হান কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
পদ্মা, গড়াই, কালীগঙ্গা ও ডাকুয়া নদীবেষ্টিত কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলাতে প্রায় ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। তার মধ্যে অন্তত এক হাজার ২৫০ হেক্টর কৃষিজমি বছরে সাত-আট মাস পানিতে ডুবে থাকে। সেখানে কৃষকরা বছরে একবার বোরো মৌসুমে চাষাবাদ করে ৬ হাজার ২২৫ টনের মতো ধান উৎপাদন করেন। অথচ জলাবদ্ধতা দূর করা গেলে আমন ও আউশ মৌসুমে আরও দশ হাজার টন ধান বা অন্যান্য শস্য উৎপাদন করা যেত। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
আধুনিক পদ্ধতি উচ্চফলনশীল ফসল চাষাবাদ করলে আরও বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, চার নদীবেষ্টিত এ উপজেলায় ছোট-বড় অসংখ্য জিকে সেচ খাল রয়েছে। তবে পরিকল্পিত নালা নেই।
যতটুকু আছে, তাও সংস্কার করা হয় না। অনেকে ভরাট করে বসতি গড়েছেন। আবার বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন অনেকে। ফলে তিন ফসলি জমিতে বছরের সাত-আট মাস পানি জমে থেকে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।প্রায় এক যুগ ধরে এভাবে চললেও প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সমাধানে উদ্যোগ নেননি। এতে হ্রাস পাচ্ছে খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন। প্রতিবছর লোকসান গুনছেন কৃষক।
সরজমিনে উপজেলার বহলবাড়ীয়া, চাঁদপুর, বাঁশআড়া, বাঁখই, করাতকান্দি ও জগন্নাথপুর বিলে গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকা পানিতে থই থই করছে। সেখানে কচুরি, কলমি, শাপলা ফুলসহ নানা রকম আগাছা জন্মেছে।
অনেকে ডিঙি নৌকায় করে মাছ ধরছেন। চলতি মৌসুমে আবাদের জন্য আগাছা পরিষ্কার করছিলেন অনেকে। চাষাবাদে লোকসান হওয়ায় অনেকে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছেন। বিলসংলগ্ন এলাকার খালজুড়ে কাটা হয়েছে পুকুর। নির্মাণ করা হয়েছে বসতবাড়ি ও রাস্তা। সংস্কারের অভাবে অনেক খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হয় না।
এসময় নন্দলালপুর ইউনিয়নের বহলবাড়ীয়া বিলের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ১৬ বিঘা জমি আছে। ১০-১২ বছর আগে খাল দিয়ে গড়াই নদীতে পানি চলে যেত। তখন তিনবার ধান হতো। এখন পানি বের না হওয়ায় কোনোমতে এক ফসল হয়।
একই বিলের কৃষক মাজেদ আলী আক্ষেপ করে বলেন, চারডে নদী। তাও পানি যায়না। মাজাসমান পানিতে কচুরিপানা-আগাছা জন্মেছে। তা পরিস্কার করতেই বিঘাপ্রতি ছয়ডা জন ( শ্রমিক) লাগে। এখানে চাষে খরচ বেশি। কিন্তু উৎপাদন ও লাভ কম। ‘
গোবিন্দপুর বিলের আব্দুস সামাদ বলেন, কোথাও খাল নেই। আবার কোথাও খাল থাকলেও পরিস্কার নেই। ফলে জমিতে পানি জমে থাকে। বছরে একবারের বেশি ফসল হয়না। কিন্তু পরিকল্পিত খাল খনন করলে এসব জমিতে বছরে তিনবার ফসল ফলানো সম্ভব।
উপজেলার সদকী ইউনিয়নের করাতকান্দি বিলে তিন বিঘা জমি আছে ষাটোর্ধ কৃষক আজাহার বিশ্বাসের। তিনি বলেন, নালার কাছে নাকাল কৃষকরা। এক চাষে ১২ থেকে ১৪ মণ ধান পাওয়া যায়। এতে যা আয় হয়, তাতে আগাছা পরিষ্কার করতেই শেষ হয়ে যায়। দুই বা তিনবার মাস চাষ করা গেলে কৃষকরা লাভবান হতো।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে প্রায় এক হাজার ২৫০ হেক্টরে পানি জমে থাকে। এর মধ্যে নন্দলালপুর ইউনিয়নে ২৯০, সদকীতে ২৫০, জগন্নাথপুরে ২৪০, শিলাইদহে ২০৫, যদুবয়রাতে ৭৫, কয়াতে ১২০ এবং চাপড়া ইউনিয়নে ৭০ হেক্টর। এতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। উপজেলায় খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও হ্রাস পাচ্ছে। যদিও ২০২৪ সালে জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ৫১০ হেক্টর।
বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বছর গেলেই বাড়ছে জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ। চলতি বছরে প্রায় এক হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধ জমিতে শুধু বোরো মৌসুমে ছয় হাজার ২২৫ টন ধান উৎপাদন হয়। কিন্তু আমন ও আউশ মৌসুমে চাষাবাদ করা গেলে আরও ১০ হাজার টন শস্য উৎপাদন করা যেত। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। তার ভাষ্য, জলাবদ্ধতা নিরোসনে স্থানীয় প্রশাসন ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.রাইসুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের চলমান খালখনন প্রকল্পে কুমারখালীর দুটি খালের প্রস্তাব পাঠানো আছে। খনন প্রকল্প শুরু হলে কিছুটা জলাবদ্ধতা নিরসন হবে। এছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষিবিভাগ, কৃষক, বিএডিসি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দেন ইউএনও।