রবিবার ১২ই জুলাই, ২০২৬ ২৮শে আষাঢ়, ১৪৩৩

প্রসঙ্গ লালন গীতির সুর বিতর্ক: অর্জুন বিশ্বাস

[print_bangla]

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম ও শুনলাম-লালনের ৬৫% গানের সুর নাকি এ কালের একজন জনপ্রিয় লালনসংগীতশিল্পী করেছেন। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। সংগীতের ওপর পড়াশোনা করার সুবাদে (বি.মিউজ..সংগীত কলেজ, ১৯৮৮) সংগীতের ইতিহাস সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশোনা করতে হয়েছে।আমাদের সংগীত-ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী শ্রদ্ধেয় সাদি মুহম্মদ তকিউল্লাহ।তিনি সংগীতের ইতিহাস সম্পর্কে অত্যন্ত সম্যক জ্ঞান রাখতেন এবং আমাদেরও জানাতেন। তাঁর কাছ থেকে ‘লালনসংগীত’সম্পর্কেও অনেক কিছু জানার সৌভাগ্য হয়েছিল।

তিনি বলতেন,লালনের গান বাংলার মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক বিস্ময়কর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ-যেমন তাঁর গানের বাণীতে,তেমনি তাঁর সুরে।তবে তিনি দুঃখ করে এটাও বলতেন,লালনের গানগুলো লোকমুখে বেঁচে থাকায় সুরের কিছু বিকৃতি ঘটেছে।কেউ কেউ আবার পাণ্ডিত্য ফলানোর চেষ্টাও করেছেন।

কোনো গান লোকমুখে প্রচারিত ও প্রচলিত হতে থাকলে কিছু বিকৃতি ঘটতেই পারে।

কারণ,সবার ধারণক্ষমতা এবং পরিবেশনভঙ্গি (গায়কি বা উপস্থাপনা) এক রকম নয়। তবে লালনের উত্তরসূরি দাবি করা কিছু পোষাকি পণ্ডিত ইচ্ছাকৃতভাবেই সুর বিকৃত করেছেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন সুর দেওয়ার অপচেষ্টাও করেছেন।আমার মতে,এভাবে তাঁরা লালনের মহত্ত্বকেই অসম্মান করেছেন।

স্যারের ক্লাসের বাইরে তাঁর পরামর্শে রেফারেন্স হিসেবে আমি ও আমরা যেসব লোকসংগীত-গবেষকের বই পড়েছি,তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন-

– মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন

– করুণাময় গোস্বামী

– আশরাফ সিদ্দিকী

– ওয়াকিল আহমেদ

– আশুতোষ ভট্টাচার্য

– আনিসুজ্জামান

– সায়মন জাকারিয়া

এ ছাড়াও আরও অনেক গবেষকের বই কমবেশি পড়েছি।কিন্তু কোথাও এমন তথ্যের কোনো আভাস পাইনি। লালনের গান মানেই সম্পূর্ণ লালনের গান।তিনি গান লিখে গেছেন,কিন্তু সুর করেননি-এমন কোনো তথ্য গবেষকেরা পাননি।

বিষয়টি শোনার পর থেকেই আমার মনে একটি খটকা লেগেছে।এরপর চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করলে সেও জানায়,লালনের সব গানের সুর তিনিই করেছিলেন; ৬৫% গান অসুরারোপিত অবস্থায় রেখে যাননি।কারণ, সে সময় গান লেখা মানেই তা গাওয়ার জন্য লেখা হতো,আর গাওয়া মানেই তো একটি সুর থাকা।

যাই হোক,চ্যাটজিপিটি যা জানিয়েছে,তার দলিলও দিলাম।

” লালন গীতির সুর কে করেছেন—এটি নিয়ে লালন গবেষক এবং বাউল সাধকদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু মতামত রয়েছে। সহজ কথায় বলতে গেলে, **লালন সাঁইজির গানের মূল সুরকার তিনি নিজেই ছিলেন। তবে পরবর্তীতে সেই সুরগুলোকে সংরক্ষণ, সংস্কার ও কিছুটা পরিমার্জন করার পেছনে আরও বেশ কয়েকজনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।**

বিষয়টি একটু বিস্তারিত এবং সহজভাবে নিচে তুলে ধরা হলো:

### ১. মূল সুরকার: লালন ফকির নিজেই

লালন শাহ যখন গান রচনা করতেন, তিনি কেবল বাণী বা লিরিক্স লিখতেন না; সেই গানগুলো তিনি একতারা বা দোতারা হাতে নিয়ে নিজেই গাইতেন। সাঁইজি তার ভাব এবং আধ্যাত্মিক দর্শনকে যেভাবে অনুভব করতেন, সেই অনুযায়ী গানের কথা ও সুর একসাথে তৈরি হতো। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া আখড়ায় তাঁর শিষ্যদের (যেমন: ভোলাই শাহ, শীতল শাহ) তিনি নিজেই গানগুলো সুর করে গেয়ে শোনাতেন এবং শেখাতেন। তাই **গানের আদি ও আসল সুর লালন ফকিরেরই দেওয়া।**

### ২. সুর সংরক্ষণ ও প্রসারে অন্যদের ভূমিকা

যেহেতু লালন শাহের সময়ে কোনো আধুনিক অডিও রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা ছিল না, তাই তাঁর গানগুলো মূলত **গুরু-শিষ্য পরম্পরায়** মুখে মুখে বা গেয়ে গেয়ে টিকে ছিল। পরবর্তীতে এই সুরগুলো লিখিত রূপ (স্বরলিপি) দিতে এবং সবার কাছে পৌঁছাতে কয়েকজন মানুষ বড় অবদান রেখেছেন:

* **রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর:** লালন শাহের গানের সুরের প্রতি রবীন্দ্রনাথ ভীষণ আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি ছেঁউড়িয়া এবং শিলাইদহ অঞ্চল থেকে লালনের গান সংগ্রহ করেন এবং তাঁর কিছু গানের সুর নিজের রবীন্দ্রসংগীতেও ব্যবহার করেছেন (যেমন: “ভেঙে মোর ঘরের চাবি” গানটির সুর লালনের “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি” গানের সুর থেকে অনুপ্রাণিত)।

* **খোন্দকার রফীকুল হক (খোন্দকার নূরুল আলম):** লালন গীতির সুর বিকৃত হওয়া থেকে বাঁচাতে এবং একটি প্রমিত রূপ দিতে পরবর্তীতে বেতার ও টেলিভিশনের জন্য অনেকে কাজ করেছেন।

* **মনসুর উদ্দিন ও ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য:** এঁরা লালনের গান সংগ্রহ করে বই আকারে প্রকাশ করেন, যা সুরের একটি স্থায়ী কাঠামো দাঁড় করাতে সাহায্য করে।

### ৩. বর্তমান সময়ের বিকৃতি ও পরিমার্জন

একটি বড় সত্যি হলো, লালন শাহের আদি বা মূল সুর হুবহু কেমন ছিল, তা শতভাগ নির্ভুলভাবে জানা আজ বেশ কঠিন। কারণ মুখে মুখে গাওয়ার কারণে সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন অঞ্চলের বাউলরা গানের সুরে কিছুটা নিজস্ব বৈচিত্র্য যোগ করেছেন।

বর্তমানে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার এবং ফিউশন (Fusion) মিউজিকের কারণে লালন গীতির সুর অনেকটা আধুনিকায়ন হয়েছে। তবে লালন ঘরানার আসল সাধুরা এখনো ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় লালন শাহের শেখানো সেই লোকজ এবং সহজ সুরেই গান পরিবেশন করার চেষ্টা করেন।

> **সারসংক্ষেপ:** লালন গীতির আদি ও প্রকৃত সুরকার **লালন ফকির নিজেই**। পরবর্তীতে অন্যান্য সাধক, সংগ্রাহক এবং সংগীতজ্ঞরা সেই সুরগুলোকে সংরক্ষণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেছেন মাত্র।”

অর্জুন বিশ্বাস ,সংগীত শিল্পী, ঢাকা, বাংলাদেশ। (ফেসবুক থেকে নেয়া)

 

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রসঙ্গ লালন গীতির সুর বিতর্ক: অর্জুন বিশ্বাস

০২ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top