
মোঃ মামুন অর-রশীদ,
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি:
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অধিকাংশ মা-বাবার একমাত্র ভরসা থাকে সন্তানের ওপর। কিন্তু সেই সন্তানদের অবহেলা, অনাদর ও অনিশ্চয়তার কারণে নিজের মৃত্যুর পর দাফনের চিন্তায় জীবিত থাকতেই নিজের কবর তৈরি করে রেখেছেন এক বৃদ্ধা মা। ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লী উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বড়বালিয়া পাইকারমনি গ্রামের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বৃদ্ধা আয়েশা খাতুন ওই গ্রামের মৃত আয়নাল হকের স্ত্রী। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ধরে তিনি সন্তানদের অবহেলার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, ছেলেরা তার কাছ থেকে সম্পদ লিখে নেওয়ার পর আর খোঁজখবর রাখে না। বড় ও ছোট ছেলের বাড়িতে কিছুদিন থাকলেও বনিবনা না হওয়ায় সেখান থেকেও তাকে চলে যেতে হয়।
পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় স্বামীর দেওয়া আড়াই শতাংশ জমিতে একটি ছোট ঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন আয়েশা খাতুন। তবে সন্তানের ওপর আস্থা হারিয়ে তিনি ঘরের পাশেই নিজের কবর তৈরি করে রেখেছেন। প্রতিদিন সেই কবরের পাশ দিয়ে হেঁটে যান, আর নীরবে মৃত্যুর অপেক্ষা করেন। মৃত্যুর পর যেন ওই কবরেই তাকে দাফন করা হয়—এ অনুরোধও তিনি এলাকাবাসীর কাছে করে রেখেছেন। কান্না জড়িত কণ্ঠে আয়েশা খাতুন বলেন, “সন্তানরা কেউ আমার খোঁজ নেয় না। ঘরের ভেতরে বৃষ্টির পানি পড়ে, বিদ্যুৎ নেই, অন্ধকারে থাকতে হয়। অনেক সময় না খেয়েও দিন কাটাতে হয়। এত কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করলাম, অথচ এখন কেউ একবারও এসে দেখে না আমি কেমন আছি।” স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি একাই ওই ঘরে বসবাস করছেন। তারা বলেন, সন্তানরা সম্পদ লিখে নেওয়ার পর আর মায়ের দায়িত্ব নেয়নি। অথচ তারা সবাই ব্যবসা করেন এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। কেউ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে উল্টো অপমান ও গালিগালাজের শিকার হতে হয়।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, একজন মায়ের এমন পরিণতি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্যই লজ্জাজনক। যে মা সারাজীবন সন্তানদের মানুষ করতে নিজের সবকিছু উৎসর্গ করেছেন, শেষ বয়সে তাকেই নিজের কবর তৈরি করে রাখতে হচ্ছে। এটি পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি নির্মম চিত্র।
এ বিষয়ে আয়েশা খাতুনের সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা বৃদ্ধার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুক এবং বৃদ্ধা আয়েশা খাতুনের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করুক। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। জে/এ
