রাঙা প্রভাত আসিবে নব কিশলয়ে: রঙের আল্পনায় সাজছে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি

[print_bangla]

মাকসুদুল হক, শিলাইদহ থেকে-

প্রধান ফটক পেরিয়েই অত্যন্ত দৃষ্টি নন্দন এবং আভিজাত্যপূর্ণ নতুন এক কুঠিবাড়ি যেন ভেসে উঠলো চোখের সামনে, নিজেকে চিমটি কেটে কোন রকমে ঝোক সামলিয়ে সামনে এগোতেই বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন কবির এর উক্তিটি মনে পড়ে গেল। “রাঙা প্রভাত আসিবে নব কিশলয়ে” পালাবদলের পালা শেষে বৈচিত্র্যময় বৈশাখেই বিশ্বলোক আলোকিত করে বিশ্বকবির আবির্ভাব হয়ে ছিলো।
আজ ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী। সেই উপলক্ষেই কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ঐতিহাসিক শিলাইদহ কুঠিবাড়ি ফিরেছে তার চিরচেনা আভিজাত্যে। এবারের ২৫ বৈশাখকে কেন্দ্র করে পুরো কুঠিবাড়ি চত্বরে চলছে রঙের মহোৎসব। যেন এক ভিন্ন আমেজে সেজেছে প্রতিটি আঙিনা ও অন্দরমহল। এবারের উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রঙের ছোঁয়া লেগেছে সোনার তরী ও গীতাঞ্জলি রেষ্ট হাউজেও।
শিলাইদহ মানেই রবীন্দ্র সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। এখানেই কবি রচনা করে ছিলেন তাঁর অমর সৃষ্টি ‘সোনার তরী’-র অধিকাংশ কবিতা এবং বিশ্বজয়ী ‘গীতাঞ্জলি’-র উল্লেখযোগ্য অংশ, সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে বিশ্রামাগারের নামকরণ করা হয়ে ছিলো। এবারের উৎসবে কুঠিবাড়ির সেই বিশেষ কোণগুলোকে সাজানো হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে, যেখানে বসে কবি কখনো নৌকায় ভেসে, কখনো বা বারান্দায় চেয়ে এই কালজয়ী সাহিত্যগুলো সৃষ্টি করে ছিলেন। প্রমত্তা পদ্মার বুকে বোট ভাসিয়ে লিখে ছিলেন ছিন্নপত্র রচনা করে ছিলেন হাজারো সংগীত। গীতাঞ্জলির আধ্যাত্মিকতা আর সোনার তরীর রূপক আবহ ফুটিয়ে তুলতে ভবনের দেওয়ালে দেওয়ালে রঙের কারুকার্যের পাশাপাশি নানা উদ্ধৃতি দিয়ে সাজানো হয়েছে।
স্মৃতির জানালায় ঠাকুর পরিবারের পদচারণা এবারের সাজসজ্জায় কবির সহধর্মিণী মৃণালিনী দেবী এবং পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত কক্ষগুলোকেও বিশেষ ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মৃণালিনী দেবীর ব্যবহৃত হেঁসেল ও অন্দরমহলের কোণায় কোণায় আল্পনার ছোঁয়া যেন সেই সময়ের পারিবারিক আভিজাত্যকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। বড় ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য বাগান এবং কবির সন্তানদের পদচারণা মুখর বারান্দাগুলোও নতুন সাজে সজ্জিত হয়েছে।
উৎসবের আমেজ দিতে কেবল মূল ভবন নয়, প্রতিটি কক্ষের কোণায় কোণায় লেগেছে আল্পনার ছোঁয়া। সিঁড়ি, বারান্দা এবং জানালার কার্নিশে দক্ষ শিল্পীরা এঁকেছেন লতা-পাতার কাজ। কবির ব্যবহৃত পালকি, পড়ার টেবিল ও দুর্লভ সিন্দুক রাখা কক্ষগুলো নতুন করে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ভবনটির উজ্জ্বল লাল দেয়াল আর সাদা বর্ডারের কাজ নতুন করে সংস্কার করায় তা দূর থেকে এক রাজকীয় রূপ ধারণ করেছে। বাদ পড়েনি হেসেঁল, ইন্দারা, পুকুর ঘাট, সাদা রঙে সহস্র আম গাছ সহ অন্যান্য গাছের গোড়ায় দৃষ্টি নন্দন প্রলেপ যেন কুঠিবাড়ি চত্বরে এক অবর্ণনীয় দৃশ্যপট ফুটে উঠেছে।
কুঠিবাড়ির ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে চলা প্রমত্তা পদ্মা নদী ছিল কবির কাব্যিক প্রেরণার প্রধান উৎস। কবির ব্যবহৃত সেই বিখ্যাত বজরার স্মৃতি স্মরণ করে নদীর তীরের অংশগুলোকেও নতুন করে সাজানো হয়েছে। পর্যটকরা যাতে নদীর ঘাটে বসে কবির সেই নিভৃত মুহূর্তগুলো অনুভব করতে পারেন, সে জন্য সেখানেও লেগেছে রঙের ছোঁয়া। পদ্মার ঢেউয়ের শব্দের সাথে রঙের আল্পনার এই মিতালি উৎসবে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।

উৎসবের প্রথম দিনের আনুষ্ঠানিকতার পর ১৪৪৭ বঙ্গাব্দের ২৬ বৈশাখ সাজানো হয়েছে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় কর্মসূচিতে। এদিন কুঠিবাড়ির মুক্ত মঞ্চে রবীন্দ্রসংগীতের বিশেষ অনুষ্ঠান ও নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হবে। কুঠিবাড়ির বাইরে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলাটি এই দিনে পূর্ণ রূপ পায়। মাটির পুতুল, হস্তশিল্প, লোকজ গান আর দরদী কন্ঠে পরিবেশন হবে রবীন্দ্র সংগীত মায়াবী সুরের মূর্ছনায় এদিন পুরো শিলাইদহ হয়ে ওঠে সংস্কৃতির এক অনন্য মিলন মেলা। অন্যান্য বছরে লাখো মানুষের সমাগম হলেও এবারে ভিন্ন মাত্রায় ভিন্ন আঙ্গিকে এক মহামিলন মেলা হতে চলেছে বলে উৎসাহি দর্শনার্থীরা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তত্বাবধানে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ এবং প্রশাসনিক কর্তা ব্যাক্তিরা বেস কর্মব্যস্ত সময় পার করছে।শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীসহ সকল শ্রেণীর ভক্ত প্রেমীদের মাঝে বিরাজ করছে এক মহা খুশির আমেজ। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাঙা প্রভাত আসিবে নব কিশলয়ে: রঙের আল্পনায় সাজছে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি

০৮ মে ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top