

আবদুল জলিলঃ
ভাঙন কবলিত যমুনা চরের কয়েক হাজার নারী শ্রমিক প্রকৃতিকে জয় করে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামে পুরুষের সাথে সমানতালে লড়ে যাচ্ছেন। এক কালের ঘরবন্দী, নির্যাতিতা, স্বামী পরিত্যক্তা অথবা বিধবা নারীদের চোখের পানি যমুনার জলে মিশে গেছে অনেক আগেই। এখন তাদের কোমল হাতে কাস্তে, কোদাল সমানতালে চলছে চরের উর্বর পলিসমৃদ্ধ মাটির বুকে। অন্যের দ্বারে দ্বারে অনেক নারী ভিক্ষুকের হাত পাতা হাত এখন যমুনার উর্বর পলি মাটিতে ফলাচ্ছে নানা ফসল। এভাবে নানামুখী কাজের মাধ্যমে অসহায়ত্বের দুর্নাম ঘুচে পরিবারে তাদের বেড়েছে সম্মান। বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম এখন তাদের নিত্যদিনের রুটিন মাফিক কাজ।
একদা প্রকৃতির নির্মমতা-নিষ্ঠুরতাই ছিলো কাজিপুরের চরের নারীদের একমাত্র নিয়তি। পুরুষের একার আয়ে যমুনার ভাঙন-ক্ষুধা-দারিদ্রকে জয় করা তাদের নিকটে ছিলো স্বপ্নের মতো। প্রকৃতির চরম পৈচাশিকতাকে বিদায় করে বেঁচে থাকার দুর্নিবার প্রচেষ্টায় তারা অনেকখানি সফল। সব অপবাদ ঘুচিয়ে ওদের হাতের ছোঁয়ায় চরের মাটিতে ফলছে সবুজ সোনালী ফসল।
সরেজমিন উপজেলার নাটুয়ারপাড়া চরে গিয়ে দেখা গেছে, যমুনার ধু-ধু মরুভূমিসম বালির মাঝে পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকেরাও বাদাম লাগাচ্ছেন। পাশেই আরেক জমিতে গিয়ে দেখা মেলে রেহাইশুড়িবেড় চরের রেহানা মজিদ দম্পতির। জমি তৈরি করে তারা ভুট্টা লাগাচ্ছেন। তাদের সাথে আরও কয়েকজন নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এসময় রেহানা জানান, “ও(স্বামী) একা কাজ করে সারতে পারে না। বাড়তি টাকাও নাই যে কামলা নিয়া কাজ করামু। বাধ্য হয়া আমি কয়েক বছর ধইরা দুইজন মিলা জমিতে কাজ করি।”
তিন বিঘা জমিকে এরইমধ্যে এই দম্পতি ভুট্টা লাগিয়েছেন। তার মধ্যে এক বিঘা নিজের। বাকি দুই বিঘা কট (বন্ধক) নিয়েছেন। রেহানাদের জমিতে দিনমজুরি কাজ করছেন ময়না খাতুন (৩২) নামের এক মহিলা। তিনি জানান, “মেয়েকে কলেজে দিচি এবার। ম্যালা খরচ। এক ছেলে ইস্কুলে যায়। ওদের রিক্সাচালক বাবায় একলা কাম কইরা যা পায় তাতে সংসার চলা কঠিন। তাই আমার প্রতিবেশি রেহানাদের জমিতে কাজ করতাছি। কাজ বুঝে দিনে তিনশ থেকে পাঁচশ টাকা পাই।”
এখন সংসার কেমন চলছে জানতে চাইলে আত্ম প্রত্যয়ের সাথে ময়না বলেন, “দুইজনের আয়ে সংসার ভালই চলছে এহন। আগেতো ম্যালা কষ্ট করা লাগছে। শরম কইরা কি হইবো। কাজ কইরা খাই। ভিক্ষাতো করি না।”
খাসরাজবাড়ি চরের হালিমার কাহিনী কিছুটা আলাদা। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ের পিড়িতে বসতে হয়েছে তাকে। ক্লাসের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন তিনি। তার চেয়ে পনেরো বছরের বড় বরের সাথে বিয়ে করতে তাকে বাধ্য করে পরিবারের লোকজন। সংসারে তার চোখের জলের কোন মূল্য ছিলো না। মেয়ে বড় হয়েছে দ্রæত বিয়ে দিতে হবে এটাই চরের অধিকাংশ দরিদ্র পরিবারের বাবা মার ধারণা। বিয়ের এক বছরেই হালিমার কোল জুড়ে আসে এক কন্যা সন্তান। তার বয়স বছর না পেরোতেই স্বামীর সংসারে হালিমার আর জায়গা হয় না। আরেকটি বিয়ে করে ঢাকায় পাড়ি জমায় হালিমার নেশাখোঁর স্বামী। একদিন আসে তালাকের কাগজ। প্রভাবশালী স্বামীর পরিবারকে কিছইু বলতে সাহস পায়না হালিমার বাবা-মা। সেই থেকে বিগত দশ বছর তিনি নিজের মেয়েকে নিয়ে বাবা মায়ের সংসারে বসবাস করছেন। নিজের দোষ না থাকলেও পরিবার থেকে হালিমাকে অনেক সময় গালমন্দ শুনতে হয়। যেন এই ভাগ্যের জন্যে তিনি নিজেই দায়ী। একদিন চোখের জল মুছে বাড়ির পাশের কিছু পরিত্যক্ত জমিতে হালিমা নেপিয়ার জাতীয় ঘাসের চাষ করেন। পরিসমৃদ্ধ মাটিতে সে ঘাস বড় হয় দ্রæত। একদিন পাশের বাড়ির এক চাচা এসে হালিমাকে পাঁচশ টাকা দিয়ে সেই ঘাষ কিনে নেয়। এই প্রথম নিজের পরিশ্রমের পাঁচশ টাকা পাল্টে দেয় হালিমার জীবন। ধীরে ধীরে তিনি আরও জমি বন্ধক নিয়ে ঘাষের চাষ শুরু করেন। বাবা মা তাকে এই কাজে বাধা দেয়না। বিগত সাত বছরে ঘাস বেঁচেই হালিমা এখন স্বাবলম্বী। ঘাস চাষের পাশাপাশি নিজের বাড়িতে তিনি মুরগির খামার করেছেন। সেখানে দুইজন নারী শ্রমিক কাজ করেন। খামার থেকে এখন বেশ টাকা পাচ্ছেন তিনি। মেয়েকে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। সংসারে এখন তার অনেক কদর।
হালিমা এরই মধ্যে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের মাধ্যমে ঘাস এবং হাঁস মুরগি পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এখন তিনি নানা সময়ে অফিস থেকে পরামর্শ নেন। নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হালিমা এখন অনেকের রোল মডেল। বৃদ্ধ বাবা তাকে নিয়ে সবার নিকটে গর্ব করেন এখন।