স্মরণ- বাউল সাধক শাহ সুফি হাসান আলী চিশতী-

[print_bangla]

আবদুল জলিল:

বাউল সাধক শাহ সুফি হাসান আলী চিশতী

‘যে হালে রাইখাছো দয়াল

তোমার সৃষ্টি বান্দারে

শুকুর আলহামদুলিল্লাহ তোমার দরবারে।’

Ñ বন্দনার প্রথমেই স্রষ্টার শানে এমন কথাগুলোতে সুর ঢেলে দুই মিনিটি কাল অবধি এক নিঃশ্বাসে গাওয়া হামদ দিয়ে শুরু করতেন পালাগান। কন্ঠের মাধুর্য, সুরের অভিনবত্ব আর কথার গাঁথুনী একাকার হয়ে গ্রামবাংলার বিনোদন প্রিয় মানুষের মনে জাগ্রত হত খোদাপ্রীতি। পীর-মুরশিদ কেবলার স্মৃতি রোমন্থনে ভাবের আবাহনে সিক্ত হত প্রতিটি ভাবুক হৃদয়। মিষ্টি সুরেলা ভরাট কন্ঠের দরদী উপস্থাপনায় কখন যে রাত গড়িয়ে ভোর হত, অগণন মুগ্ধ শ্রোতা টেরও পেতনা। অনেক সময় সুফীবাদের দেহ ভিত্তিক তাত্ত্বিক আলোচনায় যখন তিনি গভীর দর্শন উপস্থাপন করতেন, জীবনের পরম সত্যের নবরূপ দেখে, নিজ দেহের অচেনা গ্রহের সন্ধান পেয়ে ভক্তকুল তখন শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে-ভালোবাসায় ফকির লালন শাহের গানের সারবত্তা খুঁজে পেত Ñ

“যে মুর্শিদ সেইতো রাসুল

তাহাতে নাই কোন ভুল

খোদাও সে হয়।”

মূলত মুরশিদের দেখানো পথে জীবনের সারবত্তা খুঁজে পেতে তিনি বেরিয়েছেন দেশের প্রতিটি মাজার, সন্ন্যাসীর আখড়া, তরিকার জলসা, মুরশিদ কেবলার ঠিকানায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, খোদাকে পাওয়ার অথবা নিজে খোদার নৈকট্য লাভের জন্য অবশ্যই একটা মাধ্যম প্রয়োজন। মানুষ চাঁদে যেতে ব্যবহার করেছে প্লেনের। রাসুল (স) আল্লাহকে পেতে বেছে

নিয়েছিলেন হেরা গুহা। তাইতো নিজের জীবনে সেইরকম একজন ওলিয়ে কামেলের সান্নিধ্য একান্ত প্রয়োজন মনে করতেন। বিভিন্ন নবি-রাসুলের জীবনী, প্রেম কাহিনী, পালাগান তৈরি ও পরিবেশনার মাধ্যমে তিনি দেশের নানাস্থান ঘুরেছেন। অবশেষে ষাটের দশকে দীক্ষা নেন ফেনী জেলার দরবারে খাঁজা বারিয়ার গদীনশীন আলহাজ্ব শামছুল হুদা চিশতির (র) নিকট। সেই থেকে আমৃত্যু তিনি এই দরবারের একজন কমির্, পরে খলিফা হিসেবে সারা আসাম-বাংলা ঘুরে বেরিয়েছেন। ওসিলার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভে বিশ্বাসীদের মাঝে তিনি চিশতিয়া তরিকার দাওয়াত দিয়ে গেছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি অনেক প্রতিকূল পরিবেশকে উপেক্ষা করে এগিয়ে গেছেন মুক্তির মকসুদ মঞ্জিলের অভীষ্ট লক্ষ্যে।

যিনি অগণন ভক্ত হৃদয়ের মণিকোঠায় কথা, দর্শন ও সুরের ঝংকার তুলে ভাববাদী জগতের সন্ধান দিতেন, তিনি সদ্য লোকান্তরিত শাহ হাসান আলী চিশতী।

ষাট,সত্তর ও আশির দশকের এই সুরের সাকী আসলে ব্যক্তিগত জীবনে সংসারের মায়া জালে কখনই তেমনভাবে মনোযোগী হতে পারেননি। মানুষের মাঝেই তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় পার করেছেন। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার বিলচতল গ্রামে তার নিজ বাড়িতে তাকে খুঁজে পেয়েছেন অগনন ভক্তবৃন্দ। তার জীবনের সারবত্তা ছিল মানুষকে ভালোবাসার আহবান। তিনি বিশ্বাস করতেন ধর্মের কারণে মানুষের সৃষ্টি নয় বরং মানুষকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেবার প্রয়োজনেই ধর্মের সৃষ্টি। তাই তিনি মানব ধর্মকে সবার উর্ধে স্থান দিয়েছেন। একারণে তার নানা ধর্মমতের অসংখ্য অনুসারী রয়েছে। তিনি প্রচার করতেন রুহের কখনও মৃত্যু হয়না। অতএব মৃত্যুর পর মানুষের নফসের মাগফিরাত কামনা করা উচিত। মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রুহ তার স্থান পরিবর্তন করে একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে ঠাঁই নেয়।  পালাগান ছাড়াও  তিনি বাংলাদেশ বেতারের আয়োজনে ঢাকায় পনের দিনের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিয়ে সফলতার সাথে দ্বিতীয় গ্রেডে উত্তীর্ণ হন। তিনি ছিলেন কাজিপুরের পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে প্রচারিত গায়ক দলের সহ দলনেতা। ১৯৮৬ সালে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণে গঠিত গায়ক দলের সহ দলনেতা হিসেবে রাজধানী ঢাকায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তার প্রশিক্ষক ছিলেন কিংবদন্তী শিল্পী ও সুরকার কৃুটি মনসুর, আব্দুল লতিফ ও ফেরদৌসী রহমান।

এছাড়াও পালাগান গাইতে গিয়ে নিজেও অনেক গান রচনা এবং সুর করে গেয়েছেন। তার অনেকগুলোই সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। যেমন- “মায়ের চোখের পানিগো অঝরে অঝরে ঝরে।” “ যে হালে রাইখাছো দয়াল তোমার সৃষ্টি বান্দারে/ শুকুর আলহামদুলিল্লাহ তোমার দরবারে” অথবা “ পানি ধরিল উজান/ এমন সময় কোনবা দ্যাশে রইল্যা কালাচান রে।”

 

আমৃত্যু সুফী সাধক, উদার নীতির এই মানুষটির জন্ম ১৯৩৬ সালে বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলার ধারাবর্ষা গ্রামে। পরবর্তীতে তিনি সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার মাইজবাড়ি ইউনিয়নের বিলচতল গ্রামে ১৯৬৮ সাল থেকে বসবাস শুরু করেন।  তিনি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ৮চৈত্র ১৪১৮ বঙ্গাব্দ, ২৮ রবিউসসানী ১৪৩৩ হিজরী, ২২মার্চ ২০১২ খ্রিস্টাব্দ রোজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে নিজ বাড়িতে সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে লোকান্তরিত হয়েছেন।  যতদিন পৃথিবী থাকবে তত দিন তার স্মৃতি, তার আদর্শ বেঁচে থাকবে তার অনুসারী অগণন ভক্তবৃন্দের মাঝে।

বাউল শাহ হাসান আলী চিশতির  গাওয়া রেকর্ডকৃত (অনেকগুলোর রেকর্ড এখনো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি) পালাগানের নামের তালিকা-

(১)       ফাতেমার নিগুঢ় তত্ত্ব

(২)        শহিদ কারবালা

(৩)       শরিয়ত মারেফত

(৪)        ইউসুফ জুলেখা

(৫)       শিরি ফরহাদ

(৬)       আইয়ুব নবীর কিচ্ছা

(৭)        লাইলী মজনু

(৮)      ফেরাউনের কাহিনী

(৯)       মা ফাতেমার জীবনী

(১০)     সৃষ্টি তত্ত্ব

(১১)     নবীজির নবুয়ত লাভ

(১২)     নবীতত্ত্ব

(১৩)     হযরত আদম মা হাওয়ার জীবনী

(১৪)     চার খলিফার জীবনী (খোলাফায়ে রাশেদিন)

(১৫)     আবু হানিফার জীবনী

(১৬)    হযরত আলী ও মা ফাতেমার বিয়ের কাহিনী

(১৭)     শবে মেরাজের কাহিনী

(১৮)    পাক পাঞ্জাতনের কাহিনী

(১৯)     মনসুর হেল্লাজের কাহিনী

(২০)     নিজাম উদ্দিন আওলিয়ার কাহিনী।

এই পালাগানের রেকর্ডগুলো ছড়িয়ে ছিলো অধুনালুপ্ত কাজিপুরের মেঘাই বাজারের মৌসুুমী রেকর্ডিং হাউজ এর আবুল কালাম আজাদ মন্টুর স্টুডিওসহ, সিরাজগঞ্জের সুরবিতান এবং টাঙ্গাইল, বগুড়ার ধুনট, শেরপুর, সিরাজগঞ্জের পিপুলবাড়িয়া ও জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার তৎকালিন ক্যাসেট বিক্রেতাগণ নিজ দায়িত্বে হাসান নবীরের গান রেকর্ড করে বিক্রি করতেন।

 

 

 

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্মরণ- বাউল সাধক শাহ সুফি হাসান আলী চিশতী-

২৮ এপ্রিল ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top