
বিধান চন্দ্র সান্যাল-
একটি অচেনা বাতাসে শহরটা রোজ বদলে যায়। কেউ তার টের পায় না। মানুষের চোখের মণির ভিতর ঢুকে পড়েছে একটা ছোট ডিজিটাল চিপ। তার নাম ‘স্মৃতি-সঞ্চার’। এর ফলে কারো কোনো কথা মনে রাখতে হয় না। অতীত মানে একটা পামটপের মেমোরি কার্ড। কার জন্ম কবে, কে কাকে ভালোবাসত-সব জমা থাকে গ্লাসের মতো স্বচ্ছ চোখের ঠিক পিছনে। এই যুগে বাস করে রুদ্র। সে পুরনো দিনের কারিগর। সে মেমোরি চিপ সারাই করে না। সে হারিয়ে যাওয়া মানুষের জমানো দীর্ঘশ্বাস পরিষ্কার করে। তার দোকানের নাম—’অসমাপ্ত খাতা’।
একদিন এক অদ্ভুত মেয়ে এল তার দোকানে। মেয়েটির নাম বিদিশা । তার চোখের চিপটা পুরোপুরি নীল। এমন নীল আলো কারোর হয় না। বিদিশা বসল কাঠের মোড়ায়। সে কোনো কথা বলল না। একটা ছোট্ট কাচের শিশি রাখল টেবিলের ওপর। শিশির ভিতর একটা মৃতপ্রায় জোনাকি ছটফট করছে। রুদ্র বলল, “এটার আলো তো নিভে গেছে।” বিদিশা মৃদু হেসে বলল, “আলো নেভেনি। বন্দি হয়ে আছে। আমার চোখের চিপটা জ্যাম হয়ে গেছে। আমি এমন এক মানুষের স্মৃতি মুছতে চাই, যাকে আমি কোনো দিন দেখিইনি। কিন্তু সে আমার ভাবনায় রোজ কড়া নাড়ে।”
রুদ্র অবাক হলো। সে এমন কাজ আগে কখনো করেনি। চিপে থাকে বাস্তব স্মৃতি। যা ঘটে গেছে, তার হিসাব। কিন্তু যা ঘটেনি, তার স্মৃতি কীভাবে চিপে ঢুকল? কীভাবে তা আবার মুছে ফেলা সম্ভব? রুদ্র তার পুরনো ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা চোখে লাগাল। সে বিদিশার চোখের কোণায় হাত রাখল। চিপটা থেকে একটা মৃদু শব্দ আসছে—টিক টিক টিক। যেন একটা ঘড়ি উল্টো দিকে হাঁটছে। রুদ্র তার ল্যাপটপটা অন করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক অচেনা মানচিত্র। সেখানে কোনো রাস্তা নেই। কেবল কতগুলো না-বলা কথা আর না-হওয়া দেখা আলোর ফোঁটার মতো কাঁপছে।
বিদিসা বলল, “আমি ভবিষ্যতের এক শহরে থাকি। সেখানে ক্যালেন্ডারের পাতা আগে থেকেই লেখা থাকে। যন্ত্র ঠিক করে দেয় কার সঙ্গে কার দেখা হবে। কিন্তু আমার যন্ত্রে একটা ভুল হয়েছিল। সে আমাকে এমন একজনের কথা বলেছিল, যে আসলে জন্মই নেয়নি। অথচ সে আমার প্রতিদিনের কফি কাপে চুমুক দেয়। সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে বৃষ্টি দেখে। আমি এই কাল্পনিক মানুষকে আর সহ্য করতে পারছি না। সে আমার বর্তমানকে খেয়ে ফেলছে।” রুদ্র বুঝল, এই যুগের মানুষ যন্ত্রের দাস। তারা বাস্তব আর কল্পনার তফাত ভুলে গেছে। যন্ত্র যদি বলে কেউ আছে, তবে সে আছে। আর যন্ত্র যদি ভুল করে কোনো শূন্যতাকে ভালোবাসতে শেখায়, তবে মানুষ সেই শূন্যতাকেই আঁকড়ে ধরে।
রুদ্র তার স্ক্রু ড্রাইভারটা নিল। সে জানত, এই চিপ খোলা মানে একটা আস্ত জগতকে ভেঙে ফেলা। সে বিদিশার চোখের দিকে তাকাল। সেই নীল আলোয় সে নিজের মুখটা দেখতে পেল। সে ভাবল, সে কি নিজে খুব বাস্তব? সে তো সারাদিন অন্যের স্মৃতি পরিষ্কার করতে করতে নিজেই একটা মেমোরি কার্ড হয়ে গেছে। তার নিজের কোনো মৌলিক দুঃখ নেই। রুদ্র হাত বাড়িয়ে দিল। সে চিপটা এক টানে বের করে আনল না। সে কেবল একটা ছোট্ট তার ঘুরিয়ে দিল। তাতে কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের সংযোগটা একটু আলগা হয়ে গেল। জোনাকিটা কাচের শিশির ভিতর ডানা ঝাপটে উড়ে গেল খোলা জানালায়। বিদিশা চোখ বন্ধ করল। তার নীল আলোটা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে রূপালি হয়ে গেল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বলল, “আমি কি এখন মুক্ত?” রুদ্র বলল, “না। তুমি এখন একা। যন্ত্র তোমাকে ভুল মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল । এখন তুমি নিজের মতো করে কাউকে ভালোবাসতে পারো, যে সত্যি আছে ।”
বিদিশা দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে তখন ঝুমঝুম বৃষ্টি পড়ছে। রুদ্র জানালার ধারে এসে দাঁড়াল। সে ভাবল, পরের কাস্টমারটা হয়তো এমন এক যন্ত্র নিয়ে আসবে, যা মানুষকে ভালোবাসার বদলে ঘৃণা করতে শেখাবে। সে তার স্ক্রু ড্রাইভারটা টেবিলে রাখল। খাতার পাতা উল্টাল। সেখানে কোনো লেখা নেই। সব সাদা। সাদা পাতার উপর একটা জল পড়ার দাগ। রুদ্র সেই দাগটার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল না জলটা বিদিশার চোখের, নাকি আকাশের। জে/এ
