শনিবার ১৩ই জুন, ২০২৬ ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

বিশ্বকাপের বাঁশি-১ বিশ্বকাপের গোড়ার কথা

[print_bangla]

প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন-

ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপকে বলা হয় ‘দি গ্রেটেস্ট শো অন দ্যা আর্থ’। এবার ২৩ তম বিশ্বকাপের আসর বসছে তিনটি দেশে। অতীতে আর কখনো তিনটি দেশ এক সাথে বিশ্বকাপ আয়োজন করেনি। বিশ্বকাপ সাধারণত এককভাবে কোন দেশ আয়োজন করে থাকে, তবে ২০০২ সালে দুটি দেশ অর্থাৎ কোরিয়া-জাপান যৌথভাবে আয়োজক হয়েছে। এবার তিনটি দেশ যথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ও মেক্সিকো বিশ্বকাপের আয়োজন করছে। এর আগে ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো এবং ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল। তিনটি দেশের মধ্যে কানাডা নতুন যুক্ত হলো।
২০২৬ বিশ্বকাপের আরেকটি চমক হলো, এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৪৮ টি দল অংশ নিচ্ছে। এর আগে সর্বোচ্চ ৩২ টি দল বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলেছে। বিশ্বকাপে কিভাবে ৪৮ টি দল হলো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো কিভাবে বিশ্বকাপের আয়োজক হলো তা বলার আগে বিশ্বকাপ শুরুর ইতিহাসটা একটু বলে নিতে চাই।
প্রাচীনকাল থেকেই ফুটবল একটি জনপ্রিয় খেলা। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ খেলাকে কেন্দ্র করে ফুটবল ক্লাব গড়ে ওঠেছে। খেলাটির এ জনপ্রিয়তা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি তাদের অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় ১৯০০ সাল থেকেই একে অন্তর্ভূক্ত করে নেয়। ১৯০০ ও ১৯০৪ অলিম্পিকে ফুটবল ছিল শুধু প্রদর্শনী ম্যাচ, কিন্তু ১৯০৮ অলিম্পিক থেকে তা অফিসিয়াল ম্যাচ বা প্রতিযোগিতামূলক খেলা হিসেবে পরিগণিত হয়। খেলাটির বৈশ্বিক আবেদন বিবেচনা করে একে বৈশ্বিক রূপ দেয়ার জন্য ১৯০৪ সালে গঠিত হয় ফিফা (FIFA-Federation of International Football Association)। ফিফা’র প্রথম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ফ্রান্সের রবার্ট গুয়েরিন। তাঁর নেতৃত্বে ফিফা ১৯০৬ সালে সুইজারল্যান্ডে বিশ্বকাপ আয়োজনের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। তবে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (IOC-International Olympic Committee) অনুরোধে ফিফা ১৯২০, ১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের অলিম্পিকে IOC‘র পক্ষে অলিম্পিক ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করে এবং দারুণভাবে সফল হয়।
উল্লেখ্য, ১৯২১ সালে ফিফা’র ৩য় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন ফ্রান্সেরই জুলে রিমে। অবশ্য তিনি ১৯২০ সাল থেকেই ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। জুলে রিমের নেতৃত্বে ফিফা অলিম্পিক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনে সফল হওয়ায় সংস্থাটি পুনরায় বিশ্বকাপ আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। উরুগুয়ে ১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের অলিম্পিক ফুটবল টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন দেশ। তাছাড়া ১৯৩০ সাল ছিলো উরুগুয়ের স্বাধীনতার শততম বার্ষিকী। একে সম্মান জানিয়ে ইতালি, সুইডেন, নেদারল্যান্ড, স্পেন ও হাঙ্গেরী তাদের আবেদন প্রত্যাহার করে নিলে ১৯২৮ সালের ফিফা’র আমস্টারডাম কংগ্রেস উরুগুয়েকেই ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে মনোনীত করে।
প্রথম বিশ্বকাপে কোন বাছাই প্রক্রিয়া ছিলো না। ফিফা’র তৎকালীন সকল সদস্য দেশকেই অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়ে ছিলো। তারপরও মাত্র ১৩ টি দেশ অংশগ্রহণ করে। তন্মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৭ টি দেশ, যথা- ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, চিলি, পেরু, প্যারাগুয়ে ও বলিভিয়া; ইউরোপ থেকে ৪ টি দেশ, যথা- ফ্রান্স, যুগোস্লাভিয়া, রুমানিয়া ও বেলজিয়াম; উত্তর আমেরিকা থেকে ২ টি দেশ, যথা- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো।
১৯৩০ বিশ্বকাপে ইউরোপ থেকে কোন দল যেতে চায়নি। কেননা সেসময় ইউরোপ থেকে দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়ে যেতে জাহাজ পথে প্রায় ২ মাস লেগে যেতো। এটি এক দিকে যেমন ছিল সময় সাপেক্ষ, তেমনি ছিলো ব্যয় বহুলও। তবে ফিফা সভাপতি জুলে রিমের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় শেষতক ফ্রান্স, যুগোস্লাভিয়া, রুমানিয়া ও বেলজিয়াম ঐ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ছিলো। ১৩ জুলাই ১৯৩০। উরুগুয়ের মন্টেভিডিও শহর। স্থানীয় সময় বিকাল ৩ ঘটিকা। ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো। প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম খেলা মাঠে গড়ালো। এদিন একই সাথে দুটি ম্যাচ মাঠে গড়ায়। প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় ফ্রান্স ও মেক্সিকোর মধ্যে এস্তাদিও পচিটস মাঠে, যাতে ফ্রান্স ৪-১ গোলে জিতেছিলো। দ্বিতীয় ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামের মধ্যে এন্তাদিওগ্রান পারকিও মাঠে, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩-০ গোলে জিতেছিলো। আর ৩০ জুলাই এস্তাদিও সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে ফাইনাল খেলাটি অনুষ্ঠিত হয় উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার মধ্যে। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলাটি দেখতে সেদিন স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলো ৬৮,৩৪৬ জন দর্শক।
সে দিন আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নেয় উরুগুয়ে। এবার আসি কিভাবে ও কখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো আয়োজক হিসেবে মনোনীত হলো। ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য কানাডা, মেক্সিকো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড জোট এবং মরক্কো প্রতিদ্বন্ধিতা করে। ২০১৮ সালের ১৩ জুন মস্কোতে ৬৮তম ফিফা কংগ্রেসের সভায় ২০৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইউনাইটেড জোট ১৩৪ ভোট পেয়ে আয়োজক হওয়া নিশ্চিত করে। প্রতিদ্বন্ধি মরক্কো ৬৫ ভোট পেয়ে ছিলো।
এদিকে উয়েফার সভাপতি মিশেল প্লাতিনি ২০১৩ সালে ৪০টি দল নিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনিও টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী সংখ্যা বাড়ানোর জন্য চারটি বিকল্প প্রস্তাব দেন। যথা-
ক) ৪০টি দলে প্রসারিত করা (৫ টি দলের ৮ টি গ্রুপ) – ৮৮টি ম্যাচ
খ) ৪০টি দলে প্রসারিত করা (৪ টি দলের ১০ টি গ্রুপ) – ৭৬টি ম্যাচ
গ) ৪৮টি দলে প্রসারিত করা (৩২-দল প্লে-অফ রাউন্ডের উদ্বোধনী)–৮০টি ম্যাচ
ঘ) ৪৮ টি দলে প্রসারিত করা (৩ টি দলের ১৬ টি গ্রুপ)–৮০টি ম্যাচ
২০১৭ সালের ১০ মার্চ ফিফা কাউন্সিল ৪ টি বিকল্পের মধ্যে শেষেরটি বেছে নেয় এবং ৪৮ টি দলের টুর্নামেন্টে প্রসারিত করার জন্য সর্বসম্মতি ভাবে ভোট দেয়। তবে গ্রুপ ও ম্যাচের সংখ্যা নিয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ ফিফা কাউন্সিল একটি সংশোধিত বিন্যাস অনুমোদন করে। সংশোধিত বিন্যাস অনুযায়ী ১২টি গ্রুপ এবং প্রতি গ্রুপে ৪টি দল থাকবে। আর এতে মোট ম্যাচ সংখ্যা হবে ১০৪ টি। আমরা চলতি বছরে ‘দি গ্রেটেস্ট শো অন দ্যা আর্থ’ এর ১০৪ টি ম্যাচ দেখার সুযোগ পাচ্ছি।

(লেখক-প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন, অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ। মোবাইল- 01712277552, ইমেইল-sahadot.hossain@gmail.com)

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্বকাপের বাঁশি-১ বিশ্বকাপের গোড়ার কথা

১২ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top