শনিবার ১৩ই জুন, ২০২৬ ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

সিলেটের শাহজালাল (রঃ) ও শাহপরান (রঃ) দরগাহ আয় ব্যয়ের জবাবদিহিতার আওতায় আসছে

[print_bangla]

এম এ রশীদ সিলেট:

সাতশো বছরেরও বেশি সময় ধরে সিলেটের আকাশে-বাতাসে মিশে আছে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর নাম। যুগে যুগে লাখো মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা আর আত্মিক আশ্রয়ের কেন্দ্র হয়ে ওঠা এই দুই দরগাহ শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, সিলেটের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।

প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে, এমনকি বিদেশ থেকেও মানুষ ছুটে আসেন এখানে; কেউ প্রার্থনা নিয়ে, কেউ মানত নিয়ে, কেউবা হৃদয়ের গভীর আকাঙ্ক্ষা পূরণের আশায়। সেই সঙ্গে দান করেন অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশু ও নানা মূল্যবান সামগ্রী।

কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে ওঠা সেই বিপুল দানের অর্থের হিসাব কোথায়? কীভাবে ব্যয় হয় কোটি টাকার এই সম্পদ? দীর্ঘদিনের সেই অনুচ্চারিত প্রশ্ন এবার নতুন করে আলোচনায় এনেছে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর সিলেটের ঐতিহাসিক দরগাহ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুরু হয়েছে নতুন উদ্যোগ।

 

সম্প্রতি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে পরিকল্পনা কমিশনের উদ্যোগে ও সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের সভায় মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অস্পষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সিলেট জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে।

সিলেটে আগত প্রায় প্রতিটি দর্শনার্থীই অন্তত একবার শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে মানত, দান ও নজরানা প্রদান করেন। নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশু, খাদ্যসামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের দানও জমা পড়ে মাজারে।

স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার দান আসে এসব মাজারে। কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে পরিচালিত হয়, কোথায় ব্যয় করা হয় কিংবা কত টাকা আয় হচ্ছে; এসব বিষয়ে কখনোই জনসম্মুখে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

২০০৩ সালে শাহজালাল (রহ.) মাজারের ঐতিহ্যবাহী গজার মাছের মৃত্যুর ঘটনায় জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে দরগাহ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি। সে সময় সংবাদমাধ্যমে মাজারের বিপুল আয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তখন মাজার কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল, মাজারের দানের অর্থের একটি অংশ বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারীদের ব্যয়ে ব্যবহৃত হয় এবং অবশিষ্ট অর্থ মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হয়।

কিন্তু সেই ব্যয়ের কোনো সুসংগঠিত ও জনসম্মুখে উপস্থাপিত হিসাব কখনো দেখা যায়নি। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল ছিল।

বুধবার সিলেট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিলেট সিটি করপোরেশন, ওয়াক্ফ এস্টেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মাজার ও মাদরাসা পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় দরগাহ দুটির বর্তমান আয়-ব্যয়, দান-অনুদান, প্রশাসনিক কাঠামো, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন কমিটির পক্ষ থেকে সুসংগঠিত আর্থিক রেকর্ড ও নির্ভরযোগ্য হিসাবপত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ঘাটতির বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজার কর্তৃপক্ষের কাছে হিসাবপত্র চাওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ হিসাব উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি বলেও জানা গেছে।

সভায় বক্তারা বলেন, শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহ শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সিলেটবাসীর ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গৌরবের অংশ। তাই এর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

এসময় বক্তরা আরও উল্লেখ করেন, এসব দরগাহ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; বরং এটি সমগ্র সিলেটবাসীর সম্পদ। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিচালনা করা জরুরি।

সভায় অংশগ্রহণকারীরা মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ, নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় পরিচালনা এবং নিয়মিত অডিটের বিষয়েও মতামত দেন।

সভায় উপস্থিত ছিলেন সিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাব। তিনি বলেন, ‘মাজারের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এতে ভক্তদের আস্থা আরও বাড়বে এবং দানের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’

জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম আয় ব্যয়ের হিসাব বিষয়ে জানান, আয় ব্যয়ের মধ্যে কোনো সচ্ছতাও নেই। ওদের কাছে কোনো হিসাব নেই। তিনি বলেন, আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াক্ফ এস্টেট এবং মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে হিসাব সংরক্ষণ করবে। এই সময়ের মধ্যে আয়-ব্যয়ের সঠিক চিত্র, দানের উৎস, ব্যয়ের খাত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সভায় উপস্থিত একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি জানান, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কাউকে বিব্রত করা নয়; বরং একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে প্রশাসনের এই উদ্যোগে কিছুটা বিস্মিত হয়েছেন মাজার কর্তৃপক্ষ। শাহজালাল (রহ.) মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন, প্রশাসন কেন হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট ধারণা পাননি। সভায় অংশগ্রহণের জন্যও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। আমাদের কথাও শোনতে রাজি হননি জেলা প্রশাসক। আমরা এটা কিভাবে পেলাম এটাও শোনতে রাজি নন। আমাদের একটা কোর্টের রায় আছে। একটা মামলাও চলমান আছে। কিন্তু তিনি আমাদেরকে কথা বলারও সুযোগ দেন নি। আমরা অসহায় হয়ে বসে আছি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের হিসাবপত্র রয়েছে, তবে সেগুলো উপস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাইনি। তাই কিছু বিষয়ে অসঙ্গতি বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। তবে আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’

মাজারে আগত ভক্ত ও আশেকানদের অনেকেই মনে করেন, দানের অর্থ শুধু মাজারের উন্নয়নেই নয়, সমাজকল্যাণমূলক কাজেও ব্যয় হওয়া উচিত। আগামী এক মাসের যৌথ হিসাব সংরক্ষণ কার্যক্রম শেষে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট; সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার দাবি এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে মাজারে আসা ভক্ত আশেকানদের প্রত্যাশা।

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সিলেটের শাহজালাল (রঃ) ও শাহপরান (রঃ) দরগাহ আয় ব্যয়ের জবাবদিহিতার আওতায় আসছে

১৩ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top