শনিবার ১৩ই জুন, ২০২৬ ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নদী

[print_bangla]

বিধান চন্দ্র সান্যাল-

নদী ও বাঙালি একে অপরের পরিপূরক। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নদীর প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও আত্মিক। আবহমানকাল ধরে প্রবহমান এই জলধারা কেবল ভৌগোলিক সীমারেখাই তৈরি করেনি, বরং বাঙালির জীবনযাত্রা, লোকসংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাহিত্যের মূল সুরকে গভীর ভাবে প্রভাবিত ও সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা মূলত নদীবিধৌত এক ব-দ্বীপ অঞ্চল। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ইছামতির মতো অসংখ্য নদ-নদী জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে  দু’বাংলার ভূখণ্ডে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এই নদীগুলোকে কেন্দ্র করে মানব সভ্যতা, নগর ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। নদী আমাদের যেমন পলিমাটি দিয়ে উর্বর ফসলের জোগান দিয়েছে, তেমনি যোগাযোগ ও যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করেছে। ফলে নদীর এই চিরন্তন উপস্থিতি বাঙালির মনন ও আবেগে এক অবিচ্ছেদ্য স্থান দখল করে নিয়েছে। বাঙালির লোকসংস্কৃতির প্রতিটি পরতে পরতে নদীর গন্ধ মিশে আছে। নদীমাতৃক এই জনপদের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ও জীবন সংগ্রাম আবর্তিত হয় নদীকে ঘিরেই।  নদীর কূলে বসে মাঝি-মাল্লাদের কণ্ঠে যে সুর বেজে ওঠে, তা ভাটিয়ালি নামে পরিচিত। এই গানে রয়েছে অসীম শূন্যতা, প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেম ও জীবনের আকুলতা  শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। ময়মনসিংহ গীতিকা বা অন্য যেকোনো লোকসাহিত্যে নদী এক প্রধান পটভূমি হিসেবে উপস্থিত। এ ছাড়া আবহমান বাংলার নৌকা বাইচ, গম্ভীরা এবং ভাসান যাত্রা নদীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।
বাংলা সাহিত্যের সূচনাপর্বে নদীর উপস্থিতি লক্ষণীয়। চর্যাপদে নৌকার রূপক ও মাঝিদের জীবনের বর্ণনা রয়েছে, যা প্রমাণ করে নদী তখন যোগাযোগের প্রধান উপায় ছিল। মধ্যযুগে রচিত মঙ্গলকাব্যগুলোতে নদী এক পবিত্র সত্তা বা দেবী হিসেবে পূজিত হতো। বিশেষ করে চণ্ডীমঙ্গল বা মনসামঙ্গলে নদীপথে বাণিজ্য যাত্রা এবং দেবীর কৃপা লাভের আশায় নদীর স্তুতি গাওয়া হয়েছে। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দেব-দেবীর আখ্যান বাংলার লোকধর্মের একটি বড় দিক।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে নদী এক ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। তাঁর লেখনীতে নদী কেবল জলস্রোত নয়, বরং মানুষের সুখ-দুঃখের প্রতীক। শিলাইদহে জমিদারির সুবাদে পদ্মা নদীর বুকে কাটানো তাঁর দিনগুলো তাঁর সাহিত্যকে বিপুল ভাবে প্রভাবিত করেছিল। ‘নৌকাডুবি’, ‘পোস্টমাস্টার’ বা ‘চোখের বালি’র মতো গল্প-উপন্যাসে নদী চিত্রিত হয়েছে জীবন ও সম্পর্কের রূপক হিসেবে। এছাড়াও তাঁর অজস্র কবিতায় ও গানে নদী পেয়েছে এক দার্শনিক রূপ। ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’ কবিতাটি আজও প্রতিটি বাঙালির শৈশবের স্মৃতি।
বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে নদী-কেন্দ্রিক উপন্যাসের এক নতুন ধারার সূচনা হয়। কথা সাহিত্যিকরা নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবন, পেশা ও সংগ্রামকে অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।   মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ” পদ্মা নদীর মাঝি ” উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে নদীর ভূমিকা ও জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনসংগ্রামের এক অনন্য দলিল। এখানে পদ্মা নদী কেবল পটভূমি নয়, বরং জেলেদের ভাগ্যনিয়ন্তা এক জীবন্ত চরিত্র।  অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচিত  ” তিতাস একটি নদীর নাম ”  উপন্যাসে তিতাস নদীকে কেন্দ্র করে মালু ও তার সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনের উত্থান-পতন ও সংস্কৃতির কথা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ইছামতি’ উপন্যাসে নদী হয়ে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য সহচর।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতাতেও নদী এসেছে মুক্তির বার্তা নিয়ে। দেশাত্মবোধক ও প্রেমের গানে নজরুল নদীকে অসীমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পরবর্তীতে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় রূপসী বাংলার নদী-ধানসিঁড়ি বা সুরমা-বাংলার প্রকৃতির সৌন্দর্য ও বিষাদের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। বাংলা উপন্যাসের আধুনিক ধারায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ প্রমুখ লেখকের লেখাতেও নদী ও নদী তীরের মানুষের জীবন বরাবরই প্রধান উপজীব্য হয়েছে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নদী কেবল কল্পনার জগৎ নয়, বরং রাজনৈতিক সংগ্রাম ও জাতীয় মুক্তির এক শক্তিশালী প্রতীক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’ স্লোগানটি নদীর নাম ব্যবহার করেই রচিত হয়ে ছিল । এছাড়াও ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’ গানটি বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে নদীর অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। নদীর নামগুলো বাঙালির জাতীয় পরিচিতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে। নদী ও বাঙালি একে অপরের পরিপূরক। নদীকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস কল্পনা করা অসম্ভব। লোকগানের সুর থেকে শুরু করে আধুনিক কথাসাহিত্য পর্যন্ত-নদী তার আপন গতিতে বহমান রয়েছে । নদী আমাদের যেমন বাঁচিয়ে রাখে, তেমনি আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। তাই বাংলার নদী বাঁচিয়ে রাখা মানেই আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের মূল প্রাণপ্রবাহকে টিকিয়ে রাখা। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নদী

১৩ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top