রবিবার ১৪ই জুন, ২০২৬ ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

জনবল ও অ্যাম্বুলেন্স সংকটে গোদাগাড়ী ৩১ শয্যা হাসপাতাল চরম দুর্ভোগে রোগীরা

[print_bangla]

মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল,
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) প্রতিনিধি:

রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি (স্থানীয় ভাবে গোদাগাড়ী হাসপাতাল নামে পরিচিত) বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল সংকট এবং একমাত্র সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি বিকল হয়ে থাকায় উপজেলার হাজার হাজার মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এই অলাভজনক চিকিৎসা কেন্দ্রটি গোদাগাড়ী পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক চিকিৎসার প্রধান ভরসা। তবে বর্তমানে নানা সীমাবদ্ধতায় হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিকল অ্যাম্বুলেন্স, দ্বিগুণ ভাড়ার ভোগান্তি খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে আগত গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থানান্তরের একমাত্র মাধ্যম ছিল সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি। তবে বিগত ৩ মার্চ, ২০২৫ তারিখে একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্স চালক নিহত হন এবং গাড়িটি সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে (স্ক্র্যাপ) যায়। দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত হাসপাতালে নতুন কোনো অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
​ফলে জরুরি মুহূর্তে রোগীদের রাজশাহী নিতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আগে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকায় খুব কম খরচে জরুরি রোগী নিয়ে রাজশাহী যাওয়া যেত। এখন বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে গিয়ে দ্বিগুণ টাকা গুণতে হচ্ছে। অনেক সময় সময়মতো গাড়িও পাওয়া যায় না। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে তীব্র সংকট হাসপাতালটিতে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের সিংহভাগ পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও পরিবেশ মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ৫টি পদের সবকটিই বর্তমানে শূন্য। পূর্বে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত ৫ জন কর্মীর চুক্তির মেয়াদ গত ১ জুন শেষ হওয়ার পর থেকে নতুন কোনো কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড ও চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। যে কোনো সময় হাসপাতাল চত্বর ময়লার স্তূপে পরিণত হয়ে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীই নয়, মালী ও রাঁধুনির (কুক/মশালচী) পদের সবগুলোই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এছাড়া নিরাপত্তা প্রহরীর ২টি পদের মধ্যে ১টি, আয়ার ৩টি পদের মধ্যে ২টি এবং ওয়ার্ড বয়ের ২টি পদের মধ্যে ১টি শূন্য রয়েছে। সব মিলিয়ে ১৫টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩ জন কর্মচারী; বাকি ১২টি পদই সম্পূর্ণ খালি। এই তীব্র সংকট সমাধানের লক্ষ্যে গত ১৪ জুন হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সৈয়দ মোঃ সুমন রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ও সিভিল সার্জন বরাবর জরুরি ভিত্তিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী সরবরাহের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে একটি অফিসিয়াল চিঠি পাঠিয়েছেন। সীমাবদ্ধতার মাঝেও চলছে ওপিডি ও জরুরি সেবা ​এত শত সমস্যার মাঝেও হাসপাতালটিতে প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ২:৩০টা পর্যন্ত সরকারি টিকিটের বিনিময়ে বহির্বিভাগে (OPD) কয়েকশত রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া জরুরি বিভাগ দুর্ঘটনাজনিত বা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। ইনডোর সেবা ৩১টি শয্যায় গুরুতর রোগীদের ভর্তি রেখে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খাবার ও বিনামূল্যে ওষুধ (মজুদ সাপেক্ষে) দেওয়া হচ্ছে।
​মাতৃস্বাস্থ্য গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত চেকআপ এবং স্বাভাবিক প্রসবের (Normal Delivery) ব্যবস্থা রয়েছে। ল্যাব সুবিধা এক্স-রে এবং সাধারণ কিছু ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও জটিল পরীক্ষার সুবিধা এখানে নেই।
​উল্লেখ্য, হাসপাতালটি উপজেলার মূল চিকিৎসা কেন্দ্র গোদাগাড়ী (প্রেমতলী) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করে থাকে। আধুনিকায়নের দাবি স্থানীয়দের ​রাজশাহী-নবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে সুবিধাজনক স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এই হাসপাতালটি গোদাগাড়ী পৌর এলাকাসহ উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির মূল আশ্রয়স্থল। তবে প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। গোদাগাড়ী থেকে জেলা শহরের দূরত্ব বেশি হওয়ায় যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীদের রামেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল। এই পরিস্থিতি উত্তরণে স্থানীয় বাসিন্দারা কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন
​১. নতুন অ্যাম্বুলেন্স ও চালক নিয়োগ গত বছরের সড়ক দুর্ঘটনার পর থেকে বন্ধ থাকা অ্যাম্বুলেন্স সেবা দ্রুত চালু করার দাবি জানিয়েছেন তারা, যাতে রোগীরা প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের হাত থেকে রক্ষা পান।
২. বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত জনবল অনতিবিলম্বে গাইনি, মেডিসিন ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞসহ প্রয়োজনীয় নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালের অচলাবস্থা দূর করার দাবি জানানো হয়েছে।
৩. পূর্ণাঙ্গ আধুনিক ল্যাব সুবিধা হাসপাতালে সরকারি খরচে সব ধরনের আধুনিক ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করার দাবি স্থানীয়দের।
​ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকদের একটাই মূল দাবি গোদাগাড়ী ৩১ শয্যা হাসপাতালটিকে যেন নামমাত্র প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ফেলে না রেখে একটি আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। জরুরি চিকিৎসার জন্য যেন তাদের রাজশাহী শহরের ওপর নির্ভর করতে না হয়, সেই স্থায়ী ব্যবস্থার জন্য তারা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনবল ও অ্যাম্বুলেন্স সংকটে গোদাগাড়ী ৩১ শয্যা হাসপাতাল চরম দুর্ভোগে রোগীরা

১৪ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top