বুধবার ২৯শে জুলাই, ২০২৬ ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩

গোদাগাড়ীতে আমন চাষিদের ত্রিমুখী সংকট অনাবৃষ্টি, বাড়তি খরচ ও সার সিন্ডিকেট

[print_bangla]

মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল,
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) প্রতিনিধি​​​-

রাজশাহীর প্রধান শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল গোদাগাড়ীতে ভরা আষাঢ়েও বৃষ্টির দেখা নেই। একদিকে তীব্র খরায় রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে কৃষি উপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও তীব্র সার সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। সম্পূর্ণ প্রকৃতি নির্ভর এই চাষাবাদে এবার শুরুতেই চরম ভোগান্তি ও লোকসানের মুখে পড়েছেন প্রান্তিক চাষিরা।
উৎপাদন খরচ বাড়তি, মাঠ শুকিয়ে ধুলো রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৮৩,৬০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা গোদাগাড়ীতে। তবে আষাঢ়ের মাঝামাঝি পার হলেও বৃষ্টির দেখা না মেলায় মাঠঘাট শুকিয়ে ধুলোয় ধূসর হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে কৃষকেরা ভূগর্ভস্থ পানি তুলে চারা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেচ কাজের জন্য ডিজেল এবং বিদ্যুতের বাড়তি দামের কারণে প্রতি বিঘা জমিতে হাল চাষ ও সেচ খরচ এখন সাধারণ কৃষকের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপ বা শ্যালো মেশিন চালিয়েও পর্যাপ্ত পানি মিলছে না, যার ফলে এক ধাক্কায় উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
কৃত্রিম সার সংকট ও ডিলারদের সিন্ডিকেট অনাবৃষ্টির এই মহাসংকটের মধ্যেই কৃষকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে রাসায়নিক সারের তীব্র সংকটে। উপজেলার, ডাইংপাড়া, আমতলা, মোহনপুর ইউনিয়ন, বাসুদেবপুর, কাকন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, জমি প্রস্তুত করলেও বাজারে চাহিদামতো ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারিভাবে সারের পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও ভর্তুকি থাকার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন।
​কৃষকেরা জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দিয়ে কালোবাজার থেকে সার কিনতে হচ্ছে তাদের। বেশি দাম না দিলে ডিলাররা সার নেই বলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন এবং কোনো রশিদও দিচ্ছেন না। সারের পেছনে এই বাড়তি খরচের কারণে আমন চাষের শুরুতেই কৃষকদের পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে। ​ভোগান্তির শিকার এক প্রান্তিক কৃষক বলেন এমনিতেই আসমানে পানি নাই, শ্যালো মেশিন দিয়ে টাকা খরচ করে চারা বাঁচানো লাগতিছে। তার ওপর দোকানে গেলে কয় সার নাই। বেশি টাকা দিলে আবার ঠিকই সার বের হয়। আমাদের দেখার কেউ নাই, এবার আবাদ তুইল্যা ঘরে খাবার নিমু নাকি ঋণের টাকা শোধ করমু, ভেবে পাইছি না। ঋণ সহায়তার আশ্বাস, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন
​উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের স্বল্প মেয়াদি ও আধুনিক উফশী জাত (যেমন: ব্রি ধান-৭১, ব্রি ধান-৭৫) চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০,০০০ কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে মাত্র ৮% সুদে কৃষি ঋণ দেওয়ার কার্যক্রমের কথা বলা হলেও প্রান্তিক কৃষকেরা এর সুফল পাচ্ছেন না। ব্যাংকের জটিল কাগজপত্র ও জামানতের গ্যাঁড়াকলে পড়ে সাধারণ চাষিরা ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে বাধ্য হয়ে স্থানীয় চড়া সুদের মহাজন বা এনজিওর দিকে ঝুঁকছেন। ​কৃষি সংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি খাতকে বাঁচাতে হলে কেবল প্রাকৃতিক বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে থাকা চলবে না। অবিলম্বে সারের বাজার মনিটরিং করে কৃত্রিম সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে কৃষকেরা আমন চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোদাগাড়ীতে আমন চাষিদের ত্রিমুখী সংকট অনাবৃষ্টি, বাড়তি খরচ ও সার সিন্ডিকেট

১১ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top