
বৃষ্টির ঘ্রাণে তুমি
বিধান চন্দ্র সান্যাল-
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। ঘরে টিমটিমে টেবিল ল্যাম্পের আলো। নীলিমা এক কাপ কফি হাতে চেয়ারে বসে আছে। ঠিক এইরকমই এক বর্ষার রাতে তার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল রুদ্র। কিন্তু আজ হঠাৎ তার নিঃশ্বাসের শব্দে চমকে উঠল নীলিমা। বাইরের প্রবল বৃষ্টি আর মেঘের গর্জনের মধ্যেও ঘরের ভেতরের দরজা খোলার অদ্ভুত এক শব্দ হলো। নীলিমা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল, বসার ঘরের অন্ধকার কোণটা থেকে কেউ একজন এগিয়ে আসছে। আস্তে আস্তে অন্ধকার ভেদ করে যে অবয়বটি স্পষ্ট হলো, তা অবিকল রুদ্র। পরনে সেই চেনা জলভেজা শার্ট, চোখে সেই আগের মতো রহস্যময় হাসি।
নীলিমা কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে কাঁপাকণ্ঠে বলল, “তুমি? রুদ্র, তুমি তো…” রুদ্র সোফায় বসে মৃদু হেসে বলল, “আমি তো পুলিশ রেকর্ড অনুযায়ী গত বছরই ঝড়ের রাতে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছি, তাই তো? কিন্তু নীলিমা, সত্য সবসময় চোখের সামনে যা দেখা যায় তা নয়। বৃষ্টির জলের প্রতিটি ফোঁটার মতোই আমি মিশে আছি।” ভয় এবং বিস্ময়ে নীলিমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। সে ভালো করেই জানত রুদ্র আর নেই। তবে কি সে কোনো প্রেতাত্মার মুখোমুখি? রুদ্র সোফা থেকে উঠে নীলিমার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এল। তার পা থেকে চুইয়ে পড়া জল মেঝেতে জমা হচ্ছিল। রুদ্রর ঠান্ডা হাত নীলিমার কাঁধে পড়তেই নীলিমা এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করল।
রুদ্র তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “তুমি ভেবেছিলে আমাকে তোমার পথ থেকে সরিয়ে দিয়ে ওই গোপন ডায়রিটি নিজের কাছে রাখবে? আর সেই ব্ল্যাকমেইলের টাকাগুলো নিয়ে শান্তিতে বাঁচবে?” নীলিমার চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। সে তো জানত এই ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কথা কেউ জানে না। রুদ্র তার কানের কাছে মুখ এনে আরও নিচু স্বরে বলল, “মৃত্যুর পরেও সব হিসাব শেষ হয়ে যায় না। তুমি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ নীলিমা, আর এই বৃষ্টির রাতে তার শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে।”
টেবিলের ওপর রাখা চকচকে ছুরিটার দিকে নীলিমার চোখ চলে গেল। কিন্তু রুদ্রর হিমশীতল হাত তার গলা চেপে ধরেছে। নীলিমা ছটফট করতে লাগল। রুদ্রের হাত আরও শক্ত হয়ে বসল তার গলার ওপর। ঠিক তখনই বাজ পড়ার বিকট শব্দে কেঁপে উঠল পুরো বাড়ি। রুমের আলো নিভে গেল। অন্ধকারে নীলিমা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। কয়েক মিনিট পর যখন জেনারেটরের আলো জ্বলল, তখন সোফায় কেউ নেই। বসার ঘরটি একদম শান্ত। কেবল মেঝেতে জমা জলের কিছু দাগ আর নীলিমার নিথর দেহ পড়ে আছে। জানালার কাঁচ বেয়ে তখনো বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে। জে/এ
