মঙ্গলবার ২৮শে জুলাই, ২০২৬ ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩

প্রযুক্তির দিগন্তে বেতাত্ত্বিক রোমাঞ্চ: ডি-এক্সিং-এর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

[print_bangla]

বিধান চন্দ্র সান্যাল-

‘ডি-এক্সিং’ (DXing) শব্দটির উৎপত্তি ‘Distance’ বা দূরত্বের ধারণা থেকে। রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে বহু দূরের, কখনো বা অন্য কোনো মহাদেশের অদৃশ্য স্টেশন বা অ্যামেচার রেডিও অপারেটরের সংকেত ধরতে পারাই হলো ডি-এক্সিং। প্রযুক্তির চরম উন্নতির যুগে আজ যখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সাথে মুহূর্তের মধ্যে স্মার্টফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যায়, তখন রেডিওর নব ঘুরিয়ে দূরবর্তী সংকেত ধরার এই শখটিকে অনেকের কাছেই এক ‘রাজকীয় শখ’ বলে মনে হয়। প্রযুক্তির দাপটে এই শখটি কি সত্যিই হারিয়ে যাবে, নাকি এক নতুন রূপ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হবে-এই প্রবন্ধে সেই বিষয়টিরই একটি সামগ্রিক রূপরেখা তুলে ধরা হলো।
ডি-এক্সিং কী এবং তার সোনালী অতীত-ডি-এক্সিং হলো মূলত দূর-দূরান্তের রেডিও বা টেলিভিশন সংকেত গ্রহণ এবং তা শনাক্ত করার শিল্প ও বিজ্ঞান। উনিশ শতকের শেষ ভাগে ও বিশ শতকের শুরুতে যখন রেডিও প্রযুক্তির প্রসার ঘটতে শুরু করে, তখন থেকেই মানুষের মনে কৌতূহল জাগে যে, তার বাড়ির রেডিও সেটটি ঠিক কত দূরত্বের সংকেত ধরতে সক্ষম। এই শখের মূল আকর্ষণ ছিল অজানা-অচেনা কোনো দেশের ভাষা, সংস্কৃতি এবং সংগীত নিজের ড্রয়িংরুমে বসে উপভোগ করা। ডি-এক্সাররা (DXers) বা শর্টওয়েভ লিসেনাররা (SWLs) যখন কোনো দূরবর্তী স্টেশন থেকে অস্পষ্ট সিগন্যাল ধরতে পারতেন, তখন তাঁরা সেই স্টেশনে ‘রিসেপশন রিপোর্ট’ (Reception Report) পাঠাতেন, স্টেশন কর্তৃপক্ষ যদি সেই রিপোর্ট সঠিক বলে প্রমাণ পেত, তবে তারা শ্রোতাকে একটি আকর্ষণীয় ‘কিউএসএল কার্ড’ (QSL Card) বা ভেরিফিকেশন লেটার পাঠাত, এই কিউএসএল কার্ড সংগ্রহ করা ছিল ডি-এক্সারদের কাছে একটি ট্রফি জয়ের মতো। তখনকার দিনে ডাকযোগে হাজার হাজার মাইল দূরের কোনো দেশ থেকে এই স্বীকৃতি পাওয়া ছিল এক বিশাল রোমাঞ্চের বিষয়।
প্রযুক্তির অগ্রগতি ও অ্যানালগ যুগের অবসানে-বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত শর্টওয়েভ (SW) এবং মিডিয়াম ওয়েভ (MW) ব্যান্ডে এই শখটি তুঙ্গে ছিল। বিশ্বের বড় বড় সব আন্তর্জাতিক ব্রডকাস্টিং স্টেশন, যেমন- বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা, রেডিও পিকিং, রেডিও মস্কো ইত্যাদি শক্তিশালী শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সারা বিশ্বে তাদের অনুষ্ঠান প্রচার করত। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশ এই শখের মূলে প্রথম ধাক্কাটি দেয়। ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের যুগ শুরু হওয়ার পর শর্টওয়েভ রেডিওর প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যায়। অ্যানালগ শর্টওয়েভ সম্প্রচার ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে এবং অনেক বড় বড় ব্রডকাস্টার তাদের শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার বন্ধ করে ইন্টারনেটে অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী ডি-এক্সারদের জন্য শোনার মতো স্টেশনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায়। এছাড়াও, আধুনিক প্রযুক্তির ডিজিটাল ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসগুলো থেকে প্রচুর ‘ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্টারফেয়ারেন্স’ (EMI) বা নয়েজ তৈরি হয়, যা দুর্বল রেডিও সংকেত শোনার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শহরাঞ্চলে অ্যানালগ ডি-এক্সিং করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডি-এক্সিং কি হারিয়ে যাবে? অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ইন্টারনেট ও ইউটিউবের যুগে যেখানে ঘরে বসেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের রেডিও শোনা যায়, সেখানে রেডিওর নব ঘুরিয়ে কষ্ট করে বিদেশি স্টেশন ধরার কোনো মানে হয় কি? এই প্রসঙ্গে বিভিন্ন রেডিও ফোরাম ও কমিউনিটিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একদল প্রবীণ ও খাঁটি ডি-এক্সারের মতে, অ্যানালগ রেডিওর সেই নিজস্ব হিসহিসানি শব্দ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে যুদ্ধ করে কোনো দুর্বল সংকেতকে পরিষ্কার ভাবে শোনার যে আনন্দ, তা ইন্টারনেট স্ট্রিমিংয়ে নেই। ইন্টারনেটে ক্লিক করলেই গান বাজে, কিন্তু সেখানে কোনো অজানা যাত্রার রোমাঞ্চ থাকে না। তাদের মতে, শর্টওয়েভ সম্প্রচার কমে যাওয়ার কারণে হয়তো একদিন এই প্রথাগত শখটি জাদুঘরে চলে যাবে। অন্য দিকে, বাস্তবের চিত্র কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। রেডিও স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ কখনোই নিঃশেষ হয়ে যায়নি। যদিও বড় বড় আন্তর্জাতিক স্টেশনগুলো তাদের সম্প্রচার গুটিয়ে নিয়েছে, কিন্তু এভিয়েশন (বিমান চলাচল), মেরিটাইম (সমুদ্রগামী জাহাজ), এবং বিভিন্ন ইউটিলিটি স্টেশন এখনো অ্যানালগ ও ডিজিটাল মোডে তাদের সংকেত প্রেরণ করে চলেছে। এমনকি ‘ডিজিটাল রেডিও মন্ডিয়াল’ (DRM) প্রযুক্তির মাধ্যমে শর্টওয়েভ ব্যান্ডকে নতুনভাবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। ডি-এক্সিং চর্চা এখনও টিকে রয়েছে কারণ মানুষ কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং অজানা সংকেত উদ্ধারের নেশায় এটি করে থাকে।
ডি-এক্সিং-এর নতুন রূপ: ডিজিটাল ও ওয়্যারলেস
প্রযুক্তির চরম উন্নতি ডি-এক্সিং-কে ধ্বংস করেনি, বরং একে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা ও উচ্চতা দান করেছে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে ডি-এক্সিং অন্য এক রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। আধুনিক যুগের ডি-এক্সাররা যেভাবে এই শখটিকে টিকিয়ে রেখেছেন এবং এগিয়ে নিচ্ছেন, তার কয়েকটি প্রধান রূপ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ডিজিটাল মোড (Digital Modes) এবং ওয়েব এসডিআর (WebSDR): প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে এখন আর নিজের বাড়িতে বিশাল অ্যান্টেনা বসানোর প্রয়োজন হয় না। সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা শত শত ‘সফটওয়্যার ডিফাইন্ড রেডিও’ (WebSDR) ইন্টারনেটের মাধ্যমে সাধারণ ডি-এক্সারদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। ব্যবহারকারী নিজ ঘরে বসেই অন্য একটি দেশের রিসিভারের মাধ্যমে সেখানকার সংকেত নিজের কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে শুনতে ও রেকর্ড করতে পারেন।
অ্যামেচার রেডিও কমিউনিটিতে এফটি৮ (FT8) বা ডব্লিউজেএসটি-এক্স (WSJT-X)-এর মতো ডিজিটাল মোডগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই মোডগুলো এতটাই সংবেদনশীল যে, খালি কানে শোনা যায় না এমন দুর্বল সিগন্যালও কম্পিউটারের সাহায্যে ডিকোড করে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের রেডিও অপারের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়।
২. ইউটিলিটি এবং স্ক্যানার ডি-এক্সিং (Utility & Scanner DXing): প্রচলিত ব্রডকাস্টিং স্টেশন কমে গেলেও ইউটিলিটি ডি-এক্সিং দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। ডি-এক্সাররা এখন বাণিজ্যিক রেডিওর বাইরে বিভিন্ন গোপন বা বিশেষ সংকেত খোঁজার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রের মাঝে চলাচলকারী জাহাজ, আকাশে ওড়া বিমানের পাইলট এবং কন্ট্রোল টাওয়ারের মধ্যকার যোগাযোগ (VHF/UHF Airband), আবহাওয়া সম্পর্কিত রেডিও (VOLMET), সামরিক বাহিনীর সিগন্যাল এবং সামুদ্রিক উদ্ধারকারী দলের ফ্রিকোয়েন্সি। এই ধরনের সিগন্যাল ধরা এক গোয়েন্দাগিরির মতো রোমাঞ্চকর।
৩. স্যাটেলাইট ডি-এক্সিং (Satellite DXing):
প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে অনেক রেডিও শৌখিন মানুষ ‘হ্যাম’ (HAM) রেডিওর মাধ্যমে মহাশূন্যে থাকা অপেশাদার কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের সিগন্যাল ধরার চেষ্টা করেন। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা বিভিন্ন স্যাটেলাইটের (যেমন- ISS বা International Space Station) সংকেত নিজেদের বহনযোগ্য রেডিও দিয়ে গ্রহণ করা এবং অন্য দেশের হ্যাম রেডিও অপারেটরদের সাথে যোগাযোগ করা এক আধুনিক ডি-এক্সিং।
৪. এসডিআর ডঙ্গল এবং সফটওয়্যার (SDR Dongles & Software): অ্যানালগ রেডিও রিসিভারের দাম অনেক সময় বেশি হয়, কিন্তু বর্তমানে অত্যন্ত কম মূল্যে ‘ইউএসবি এসডিআর ডঙ্গল’ (USB RTL-SDR) পাওয়া যায়। এই ছোট্ট ডিভাইসটি একটি সাধারণ কম্পিউটারের সাথে যুক্ত করে বিশাল ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জ স্ক্যান করা যায়। এর সাথে ব্যবহৃত স্পেকট্রাম অ্যানালাইজার সফটওয়্যার সংকেতগুলোকে চোখের সামনে দৃশ্যমান করে তোলে, যা ডি-এক্সারদের সিগন্যাল শনাক্ত করতে দারুণভাবে সাহায্য করে।
৫. আল্ট্রা-লাইট ডি-এক্সিং (Ultralight DXing):
ডিজিটাল যুগে এসেও একদল শৌখিন মানুষ পকেট-সাইজের ছোট রেডিও বা আল্ট্রা-লাইট রিসিভার নিয়ে মাঠ-ঘাটে ঘুরে বেড়ান। তারা জটিল অ্যান্টেনার পরিবর্তে ‘ফ্যারাইট বার’ (Ferrite Loopstick) এবং বহনযোগ্য অ্যান্টেনা ব্যবহার করে দূরবর্তী মিডিয়ামওয়েভ স্টেশন বা এফএম (FM) স্টেশন ধরার চেষ্টা করেন। প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, নিজের বুদ্ধিমত্তা ও সাধারণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দূরবর্তী সিগন্যাল ধরার এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার আনন্দ এখনো তরুণদের এই শখের প্রতি আকৃষ্ট করছে। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রযুক্তির দিগন্তে বেতাত্ত্বিক রোমাঞ্চ: ডি-এক্সিং-এর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

১৮ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top