বুধবার ২৯শে জুলাই, ২০২৬ ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩

ভাণ্ডারিয়ার বোথলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভুয়া আয়-ব্যয়ের হিসাব পাসের চেষ্টার অভিযোগে তোলপাড়

[print_bangla]

ক্যাশিয়ার নিয়োগের রেজুলেশনে স্বাক্ষরের পর সংযুক্ত প্রায় পাঁচ লাখ টাকার হিসাবের অভিযোগ-রেজুলেশন বাতিলের দাবিতে শিক্ষকদের প্রতিবাদ

এমএফএইচ রাজু | ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ৪ নম্বর ইকড়ি ইউনিয়নের বোথলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অজান্তে রেজুলেশনে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংযুক্ত করে অনুমোদনের চেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। নতুন সাময়িক ক্যাশিয়ার নিয়োগের বিষয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার পর একই রেজুলেশনের নিচে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব, হিসাব নিরীক্ষা ও অনুমোদনের বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বিদ্যালয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক অবসরে যাওয়ার পর থেকে সহকারী শিক্ষক শ্যামল কৃষ্ণ মিস্ত্রী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।

শিক্ষকদের অভিযোগ, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রায় ২০ মাসের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব কখনো শিক্ষক-কর্মচারীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ওই সময়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, রবিবার সকালে বর্তমান ক্যাশিয়ার দেবাশীষ সমাদ্দারের দায়িত্ব পরিবর্তন করে নতুন সাময়িক ক্যাশিয়ার নিয়োগের বিষয় উল্লেখ করে একটি আংশিক লেখা রেজুলেশনে শিক্ষকদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে শিক্ষকরা দেখতে পান, তাদের স্বাক্ষরের নিচের ফাঁকা অংশে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব, হিসাব নিরীক্ষা এবং অনুমোদনের বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে। অথচ এসব বিষয়ে কোনো সভায় আলোচনা হয়নি কিংবা শিক্ষকদের সম্মতি নেওয়া হয়নি বলে দাবি তাদের।

সহকারী শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম (ইসলাম শিক্ষা) বলেন, আমরা শুধু সাময়িক ক্যাশিয়ার নিয়োগের বিষয়ে স্বাক্ষর করেছি। পরে দেখি একই রেজুলেশনে আয়-ব্যয়ের হিসাব যুক্ত করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন আমরা সেই হিসাব নিরীক্ষা ও অনুমোদন করেছি। এটি আমাদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। আমরা ওই রেজুলেশন বাতিলের দাবি জানিয়েছি।

সহকারী শিক্ষক তাজিনুর আক্তার বলেন, প্রথমে ক্যাশিয়ার পরিবর্তনের বিষয়টি দেখিয়ে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে জানতে পারি, রেজুলেশনের ফাঁকা অংশে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি ধরা পড়ার পর আমরা সবাই রেজুলেশন বাতিলের দাবি জানাই।

সহকারী শিক্ষক প্রশান্ত বলেন, আমাদের স্বাক্ষর ব্যবহার করে আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুমোদিত দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিষয়টি সময়মতো ধরা না পড়লে অজান্তেই আমরা একটি হিসাবের দায়ভার বহন করতে হতো।

সহকারী শিক্ষক শিশির কুমার বলেন, তিনিসহ অন্যান্য শিক্ষক বিষয়টি জানতে পেরে একযোগে রেজুলেশন বাতিলের দাবি জানান।

শিক্ষকদের অভিযোগ, রেজুলেশন বাতিলের দাবি জানালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল কৃষ্ণ মিস্ত্রী সকাল প্রায় ১১টার দিকে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন এবং দীর্ঘ সময় কক্ষের ভেতরেই অবস্থান করেন।

এ সময় সহকারী শিক্ষকরা বারবার তাকে বিতর্কিত রেজুলেশনটি বাতিল করার অনুরোধ জানান। তবে তিনি তাতে সম্মতি দেননি বলে অভিযোগ তাদের।বিদ্যালয় ছুটির পরও তিনি কক্ষ থেকে বের না হওয়ায় শিক্ষক, কর্মচারী ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে সন্ধ্যার দিকে তিনি কক্ষ থেকে বের হন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল কৃষ্ণ মিস্ত্রী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি শুধু মুঠোফোনে বলেন, রেজুলেশনটি ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিয়েছি। এ বিষয়ে এখন আর কোনো মন্তব্য করব না।

এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাসিবুল হাসান বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি। আগামীকাল (২৭ জুলাই) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে উভয় পক্ষকে ডাকা হয়েছে। তাদের বক্তব্য শুনে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

ঘটনার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা বিতর্কিত রেজুলেশন বাতিল, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের নিরপেক্ষ নিরীক্ষা, পূর্ণাঙ্গ আর্থিক হিসাব প্রকাশ এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে। ফলে সোমবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য শুনানির দিকে এখন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।

উল্লেখ্য, বোথলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল কৃষ্ণ মিস্ত্রী এর আগেও একটি ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নামাজরত অবস্থায় নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে। পরে তিনি শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

তবে সে সময় শ্যামল কৃষ্ণ মিস্ত্রী দাবি করেছিলেন, নামাজ আদায়ের কারণে নয়, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তিনি তাদের শাসন করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনও তাকে সতর্ক করেছিল বলে জানা যায়।

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাণ্ডারিয়ার বোথলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভুয়া আয়-ব্যয়ের হিসাব পাসের চেষ্টার অভিযোগে তোলপাড়

২৬ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top