
বিধান চন্দ্র সান্যাল-
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতি এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন একমেরু কেন্দ্রীক বিশ্ব ব্যবস্থা এখন তীব্র চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ গোলার্ধে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের অগ্রভাগে রয়েছে ‘ব্রিকস’ (BRICS)। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত এই জোটটি আর কেবল উদীয়মান অর্থনীতির অর্থনৈতিক ফোরাম হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির এক প্রভাবশালী সমীকরণ হয়ে উঠেছে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির উত্তাল প্রেক্ষাপটে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, যা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে বড় প্রাসঙ্গিকতা নিহিত রয়েছে গ্লোবাল সাউথ বা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার মধ্যে। দীর্ঘকাল ধরে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়শই অনুভব করে যে তাদের স্বার্থ ও সমস্যাগুলো এই নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত থাকে। ব্রিকস এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছে। আসন্ন সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং ন্যায্য বাণিজ্যের দাবিগুলো জোরালোভাবে উত্থাপিত হবে। পশ্চিমা আধিপত্যের বিপরীতে একটি বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ব ব্যবস্থা (Multipolar World Order) গড়ে তোলার যে আকঙ্ক্ষা গ্লোবাল সাউথের রয়েছে, আসন্ন সম্মেলন তা বাস্তবায়নের একটি বড় মঞ্চ।
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির আরেকটি বড় সংকট হলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যকে ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির প্রবণতা অনেক রাষ্ট্রকেই বিকল্প খোঁজার তাগিদ দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকসের আসন্ন সম্মেলনে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনার বিষয়টি অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ব্রিকস দেশগুলো ইতিমধ্যে তাদের নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন বাড়িয়েছে এবং একটি অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা বা ডিজিটাল মুদ্রা চালুর বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবে ঋণ সহায়তার পরিধি বাড়াচ্ছে। আসন্ন সম্মেলনে যদি এই অর্থনৈতিক বিকল্প ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী রূপ নেয়, তবে তা বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটাবে।
বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে জোটের সম্প্রসারণ বা ‘ব্রিকস প্লাস’ (BRICS+) ধারণাটি আসন্ন সম্মেলনের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল এবং মধ্যম শক্তির দেশ-যেমন মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো-এই জোটে যোগ দিতে তীব্র আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত সম্মেলনগুলোতে বেশ কয়েকটি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার পর, আসন্ন সম্মেলনেও নতুন সদস্য পদপ্রার্থীদের নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এই সম্প্রসারণ প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক রাজনীতিতে ব্রিকসের গ্রহণযোগ্যতা ও আকর্ষণ দ্রুত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর ব্রিকসে অন্তর্ভুক্তি বা অংশীদারিত্ব বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিতে পারে, যা পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।
তবে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের পথ যে একেবারে মসৃণ, তা বলা যায় না। এই জোটের অভ্যন্তরে কিছু নিজস্ব দ্বন্দ্ব ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম অংশ। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মধ্যকার সীমান্ত বিরোধ এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা ব্রিকসের ঐক্যকে প্রায়শই পরীক্ষার মুখে ফেলে। ভারত একদিকে যেমন ব্রিকসের মাধ্যমে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব দিতে চায়, অন্যদিকে কোয়াড (QUAD) জোটের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে। বিপরীত দিকে, চীন ও রাশিয়া এই জোটকে সরাসরি মার্কিন-বিরোধী একটি শক্তিশালী ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে আগ্রহী। ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা আবার একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পছন্দ করে। আসন্ন সম্মেলনে এই অভ্যন্তরীণ ভিন্নতা ও স্বার্থের সংঘাত দূর করে কীভাবে একটি যৌথ ইশতেহার এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন করা যায়, তা হবে জোটের নেতৃত্বের জন্য এক বড় পরীক্ষা।
একই সাথে, চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং তাইওয়ান প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বৈশ্বিক উত্তেজনা আসন্ন সম্মেলনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাশিয়ার কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর ক্ষেত্রে ব্রিকস একটি বড় হাতিয়ার। পশ্চিমা দেশগুলো যখন রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টা করছে, তখন ব্রিকস সম্মেলন প্রমাণ করে যে বিশ্ব রাজনীতির একটি বড় অংশ এখনও রাশিয়ার সাথে সংলাপে ইচ্ছুক। অন্যদিকে, চীন এই সম্মেলনের মাধ্যমে গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারে তার আধিপত্য আরও সুসংহত করতে চাইবে।
পরিশেষে বলা যায়, আসন্ন ব্রিকস সম্মেলন কেবল একটি রুটিনমাফিক কূটনৈতিক বৈঠক নয়। এটি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং ক্ষমতার নতুন বিন্যাসের এক স্পষ্ট প্রতিফলন। পশ্চিমা শক্তির বিকল্প কোনো সামরিক ব্লক তৈরি করা ব্রিকসের লক্ষ্য নয়, বরং একটি সমতাভিত্তিক, বহু-মেরুবিশিষ্ট এবং ন্যায্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য। অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সত্ত্বেও, যদি এই সম্মেলন থেকে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য, নতুন সদস্য গ্রহণ এবং বৈশ্বিক সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো রোডম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হয়, তবে তা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। বৈশ্বিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের সাফল্যের ওপর। জে/এ
