
বিধান চন্দ্র সান্যাল-
সমুদ্রের গর্জন মন্দিরা খুব ভালোবাসে। মন্দিরা একজন মেরিন বায়োলজিস্ট। সে সমুদ্রের নিচের জীব বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করে। এবার তার কাজের জায়গা বঙ্গোপসাগরের গভীর অংশ। তার সাথে আছে একটি আধুনিক রিসার্চ ভেসেল বা বৈজ্ঞানিক জাহাজ। এই জাহাজের নাম ‘সিন্ধু’। জাহাজে মন্দিরার সাথে আরও দু’জন আছেন। একজন হলেন অরিত্র, যিনি একজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ। অন্য জন দিয়া, দিয়া একজন পেশাদার স্কুবা ডাইভার এবং সমুদ্রের তলদেশের আলোকচিত্রী। তিনজনের বয়সই তিরিশের কোঠায়। তারা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সমুদ্রকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চান। আজকের সকালটা অন্যরকম। আকাশ একদম পরিষ্কার। নীল জলরাশিতে সূর্যের আলো ঝিকমিক করছে। মন্দিরা জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ল্যাপটপে ডেটা দেখছিল। অরিত্র পাশে এসে দাঁড়ালেন। অরিত্র বললেন, “মন্দিরা, আমাদের নতুন এআই ড্রোন ‘জলপরী’ রেডি। এটি জলের নিচে পাঁচ হাজার মিটার গভীরে যেতে পারে।”
মন্দিরা হাসল। সে বলল, “দারুণ! আজ আমরা সমুদ্রের সেই অংশে ড্রোন পাঠাব, যেখানে আগে কেউ যায়নি।”
দিয়া তার আধুনিক ডাইভিং স্যুট পরে তৈরি হচ্ছিলেন। তিনি বললেন, “আমিও তৈরি। ড্রোন কোনো অদ্ভুত কিছুর সন্ধান পেলেই আমি নিচে যাব। জলের নিচের দুনিয়ার ছবি তুলতে আমার আর তর সইছে না।” দুপুর বারোটা। ড্রোনটি সমুদ্রের গভীরে নামানো হলো। কন্ট্রোল রুমে বসে তিনজন মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে সমুদ্রের নিচের অদ্ভুত সব দৃশ্য। সেখানে আছে রঙিন কোরাল রিফ, অদ্ভুত আকারের জেলিফিশ এবং নিয়ন আলোর মতো উজ্জ্বল কিছু ছোট মাছ। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এত স্পষ্ট ছবি আগে কখনো দেখা যায়নি। হঠাৎ মনিটরের এক কোণায় একটা তীব্র আলো দেখা গেল। আলোটি কোনো সাধারণ মাছের নয়। অরিত্র কিবোর্ডে দ্রুত আঙুল চালালেন। তিনি বললেন, “এটির অবয়ব কোনো চেনা সামুদ্রিক প্রাণীর সাথে মিলছে না। এটি কোনো প্রাচীন জাহাজের ধ্বংসাবশেষ হতে পারে।”
মন্দিরার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল, “কিংবা এটি হতে পারে সম্পূর্ণ নতুন কোনো সামুদ্রিক উদ্ভিদের কলোনি। দিয়া, তুমি কি নিচে যেতে পারবে?” দিয়া আত্মবিশ্বাসের সাথে মাথা নাড়ল। সে বলল, “অবশ্যই। আমার অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং জলের নিচের ক্যামেরা সম্পূর্ণ ঠিক আছে।” দিয়া সাগরে ঝাঁপ দিল। আধুনিক প্রযুক্তির বিশেষ ডাইভিং স্যুটের কারণে দিয়া খুব দ্রুত গভীরে চলে গেল। জাহাজের কন্ট্রোল রুম থেকে মন্দিরা আর অরিত্র তাকে গাইড করছিলেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনে দিয়ার ক্যামেরার লাইভ ফিড দেখা যাচ্ছিল।
দিয়া যখন সেই আলোর উৎসের কাছে পৌঁছাল, সে অবাক হয়ে গেল। সেখানে কোনো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ নেই। সেখানে রয়েছে সমুদ্রের তলদেশের একটি প্রাচীন পাহাড়। সেই পাহাড়ের গায়ে এক ধরনের বিশেষ শৈবাল জন্মেছে। সেই শৈবালগুলো থেকেই এই নীল আলো বের হচ্ছে। আলোটা এতই সুন্দর যে মনে হচ্ছে জলের নিচে একটা ছোট ছায়াপথ তৈরি হয়েছে। দিয়া দ্রুত সেই শৈবালের হাই-রেজোলিউশন ছবি তুলতে লাগল। মন্দিরা মাইক্রোফোনে বলল, “দিয়া, সাবধানে অল্প কিছু নমুনা সংগ্রহ করো। আমাদের ল্যাবে এটা পরীক্ষা করতে হবে।”
দিয়া রোবোটিক হাতের সাহায্যে খুব সাবধানে কিছু শৈবাল একটি বিশেষ পাত্রে সংগ্রহ করল। হঠাৎ সমুদ্রের স্রোত বদলে গেল। জলের নিচে তীব্র টান শুরু হলো। দিয়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিল। অরিত্র স্ক্রিন দেখে বললেন, “দিয়া, দ্রুত ওপরে উঠে এসো। সমুদ্রের নিচে একটি ছোটখাটো ভূমিকম্প বা জলের ভেতরের ঝড় শুরু হচ্ছে।” দিয়া শান্ত থাকল। আধুনিক ডাইভাররা প্যানিক বা ভয় পান না। সে তার স্যুটের বুস্টার অন করল। বুস্টারের শক্তিতে সে দ্রুত ওপরের দিকে উঠতে লাগল। কিন্তু স্রোতের তীব্রতা অনেক বেশি ছিল। জাহাজে বসে মন্দিরা আর অরিত্রের বুক কাঁপছিল। অরিত্র দ্রুত জাহাজের স্বয়ংক্রিয় উদ্ধারকারী রোপ বা দড়ি সাগরে ছুড়ে দিলেন। এটি একটি আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকিং দড়ি। এটি নিজে থেকেই জলের নিচে দিয়াকে খুঁজে নিল। দিয়া দড়িটি শক্ত করে ধরল।
কয়েক মিনিটের টানটান উত্তেজনার পর দিয়া সমুদ্রের ওপরে ভেসে উঠল। অরিত্র এবং মন্দিরা তাকে জাহাজে টেনে তুলল। দিয়া হেলমেট খুলে জোরে একটা শ্বাস নিল। তারপর হাসিমুখে বলল, “আমি ঠিক আছি। আর আমাদের মিশন সফল!” রাতের বেলা জাহাজটি তীরের দিকে ফিরছিল। ল্যাবে মন্দিরা সেই শৈবাল পরীক্ষা করছিল। সে আবিষ্কার করল, এই শৈবালগুলো প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে। বর্তমান পৃথিবীতে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণতা একটি বড় সমস্যা। এই আধুনিক যুগে এই আবিষ্কার পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। তিন বন্ধু জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়াল। সমুদ্রের ওপরে এখন চাঁদের আলো। অরিত্র বললেন, “বিজ্ঞান আর মানুষের সাহস মিললে অসম্ভবকেও জয় করা যায়।” দিয়া বলল, “সমুদ্র আমাদের কত কী দেয়, অথচ আমরা একে দূষিত করি।” মন্দিরা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “সমুদ্র শুধু জলের রাশি নয়। এটি আমাদের ভবিষ্যৎ।” আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই তরুণ দল সমুদ্রের একটি বড় রহস্য উন্মোচন করল। তাদের মনে হলো, সমুদ্রের এই নীল সীমানা তাদের বারবার ডাকছে নতুন কোনো আবিষ্কারের নেশায়। জে/এ
