শনিবার ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৮শে ভাদ্র, ১৪৩৩

কৃষি জমি ভরাট করে হাউজিং: উন্নয়নের আড়ালে খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ হুমকি-

[print_bangla]

ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ-

বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক বহু বছরের। এ দেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ জীবনযাত্রা এবং খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি কৃষি। অথচ দ্রুত নগরায়ণ ও আবাসনের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিয়ত কৃষি জমি ভরাট করে গড়ে উঠছে আবাসিক প্রকল্প, হাউজিং, শিল্পকারখানা ও নানা ধরনের স্থাপনা। উন্নয়নের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিন্তু কৃষি জমি ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হতে পারে পুরো জাতিকে।
কৃষি জমি শুধু জমি নয়, খাদ্যের নিরাপত্তা:
একটি উর্বর কৃষি জমি কেবল মাটির একটি অংশ নয়-এটি খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান সম্পদ। এই জমিতে কৃষক ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, শাক-সবজি, ফলসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেন। একটি জমি বছরের পর বছর চাষাবাদের মাধ্যমে তার উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখে। কিন্তু সেই জমি একবার মাটি-বালু দিয়ে ভরাট করে হাউজিং বা স্থাপনা নির্মাণ করা হলে কৃষি কাজের সুযোগ প্রায় স্থায়ীভাবেই নষ্ট হয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া এই কৃষি জমি শুধু বর্তমান প্রজন্মের ক্ষতি নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।
আবাসন হবে, তবে কৃষিজমি রক্ষা করেই:
জনসংখ্যা বাড়ছে, মানুষের আবাসনের প্রয়োজনও বাড়ছে। তাই, আবাসন উন্নয়ন বন্ধ করার কথা বলা হচ্ছে না। প্রয়োজন হলো পরিকল্পিত আবাসন ও সুশৃঙ্খল নগরায়ণ। অনাবাদি ও অনুর্বর জমি, নির্ধারিত উন্নয়ন যোগ্য এলাকা এবং পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণের মাধ্যমে আবাসনের চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে। বহুতল ভবন ও সমন্বিত আবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে কম জমিতে বেশি মানুষের আবাসন নিশ্চিত করাও সম্ভব। প্রশ্ন হলো-যে জমিতে প্রতি বছর মানুষের খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে, সেই জমিই কেন হাউজিংয়ের জন্য প্রথম পছন্দ হবে?
কৃষি জমি কমলে বাড়বে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি:
কৃষি জমির পরিমাণ কমতে থাকলে একই পরিমাণ খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। সীমিত জমিতে অধিক উৎপাদনের জন্য বাড়তে পারে সেচ, সার, শ্রম ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের ব্যবহার। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এক পর্যায়ে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদা পূরণে পিছিয়ে পড়লে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো সংকট, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য বাজার ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। তাই, কৃষি জমি রক্ষা মানে শুধু কৃষককে রক্ষা করা নয়; দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে সুরক্ষিত রাখা।
পরিবেশের ওপরও পড়ছে বিরূপ প্রভাব:
কৃষি জমি ও খোলা জায়গা পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ পায়, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করে এবং সবুজ পরিবেশ বজায় রাখে। কিন্তু কৃষি জমি ও নিচু এলাকা ভরাট করে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ করা হলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিক ভাবে নিষ্কাশনের পথ হারায়। ফলে জলাবদ্ধতা, পানি নিষ্কাশন সমস্যা ও পরিবেশগত নানা সংকট বাড়তে পারে। শহর ও শহরতলির আশপাশে এ ধরনের অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন ভাবে দৃশ্যমান।
কৃষক হারাচ্ছেন উৎপাদনের জমি:
কৃষি জমি কমে যাওয়ার আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে কৃষকের জীবন ও জীবিকার ওপর। অনেক কৃষক জমি বিক্রি করে সাময়িক ভাবে আর্থিক সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে হারিয়ে ফেলেন কৃষি আয়ের স্থায়ী উৎস। জমি কমে গেলে কৃষকের সন্তানদেরও কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ কমে যায়। ফলে একদিকে কৃষি জমি কমছে, অন্যদিকে কৃষি পেশার প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহও কমতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের কৃষি ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রয়োজন সমন্বিত ভূমি ব্যবস্থাপনা:
কৃষি জমি রক্ষায় শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোথায় কৃষি থাকবে, কোথায় আবাসন হবে, কোথায় শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠবে-এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, ভূমি প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও ভরাটের ক্ষেত্রে নিয়মকানুন যথাযথ ভাবে অনুসরণ হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। সচেতন হতে হবে জমির মালিক ও আবাসন উদ্যোক্তাদের কৃষি জমি রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। জমির মালিক, কৃষক, আবাসন উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষ-সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। স্বল্পমেয়াদি আর্থিক লাভের জন্য উর্বর কৃষিজমি বিক্রি বা ভরাট করার আগে ভাবতে হবে, সেই জমির দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও জাতীয় মূল্য কতটা। একইভাবে আবাসন উদ্যোক্তাদেরও পরিবেশ ও কৃষি বান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
কৃষি বাঁচলে খাদ্য নিরাপত্তা বাঁচবে:
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশ বান্ধব, পরিকল্পিত ও টেকসই। কৃষি জমি ধ্বংস করে অপরিকল্পিত হাউজিং গড়ে তোলা কোনো দীর্ঘ মেয়াদি সমাধান হতে পারে না। আমাদের মনে রাখতে হবে-একটি ভবন কয়েক বছরে নির্মাণ করা যায়, কিন্তু একটি উর্বর কৃষি জমি তৈরি হতে লাগে দীর্ঘ সময়। তাই কৃষি জমি হারিয়ে গেলে শুধু একটি জমি হারায় না; হারিয়ে যায় খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা, কৃষকের জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এখনই সময় উন্নয়ন ও কৃষির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করার। ‘পরিকল্পিত আবাসন, সুরক্ষিত কৃষি জমি’-এই নীতিকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ আজকের কৃষি জমি রক্ষা করাই আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। জে/এ
কেন্দ্রীয় সভাপতি
বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন (BPF)
কৃষি লেখক, কথক-বাংলাদেশ বেতার।

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কৃষি জমি ভরাট করে হাউজিং: উন্নয়নের আড়ালে খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ হুমকি-

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top