
এমএফএইচ রাজু | ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় হত্যা মামলার তদন্ত ও রহস্য উদঘাটন, চোরাই গরু-মহিষ উদ্ধার, চুরি যাওয়া যানবাহন উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান এবং আদালতের পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তারে ধারাবাহিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে থানা পুলিশ। দেওয়ান জগলুল হাসান ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব কার্যক্রমে পুলিশের বিশেষ অভিযান ও নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে নদমূলা-শিয়ালকাঠি ইউনিয়নের শিয়ালকাঠি গ্রামের মুদি দোকানদার স্বপন কুমার বল ওরফে কালু হত্যা মামলা অন্যতম। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ওই ঘটনায় দোকানে ঢুকে তাঁকে হত্যার পর মালামাল চুরির অভিযোগ ওঠে। পরে শুভজিৎ (১৬) নামে এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় বিচার দাবিতে স্থানীয়ভাবে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়।
ইকড়ি ইউনিয়নের উত্তর আতরখালী এলাকায় পাঁচ বছর বয়সী রাইয়ান মল্লিক নিখোঁজের ঘটনায়ও তদন্তে নামে পুলিশ। নিখোঁজের তিন দিন পর শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা এলাকায় ইসমাইল শরীফ (৬০) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দ্রুত অগ্রগতির কথা জানায় পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল ও বাড়ি থেকে পাওয়া আলামতের সূত্র ধরে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগম (৫০) এবং তিন ছেলে রুবেল শরীফ (৩০), রাসেল শরীফ (২৪) ও রোমান শরীফ (১৯)কে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা কুড়ালসহ বিভিন্ন আলামত জব্দের কথাও জানায় পুলিশ।
চোরাই গবাদিপশু উদ্ধারে চলতি বছরের মার্চে দুই দিনের অভিযানে আন্তঃজেলা গরু চোরচক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ১৭টি গরু উদ্ধার করা হয়। প্রথমে ছয়টি গরুসহ মো. কামরুল হাওলাদার ও সাইদুল আকনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভিটাবাড়িয়া থেকে সাতটি এবং কাউখালীর জোলাগাতি থেকে চারটি গরু উদ্ধার করা হয়। পরে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আগস্টে নৈশকালীন টহলের সময় চারটি চোরাই মহিষসহ কামরুল হাওলাদারকে গ্রেপ্তার এবং মহিষ বহনে ব্যবহৃত একটি মিনি ট্রাক জব্দ করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, মহিষগুলো ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া থেকে চুরি করা হয়েছিল। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কামরুলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ডাকাতি, দস্যুতা ও চুরিসহ ১৫টি মামলা রয়েছে।
এ ছাড়া ভাণ্ডারিয়া থেকে চুরি হওয়া একটি অটো জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে নেছারাবাদে শনাক্ত করে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মাদকবিরোধী অভিযানেও একাধিক সাফল্যের কথা জানিয়েছে থানা পুলিশ। বিভিন্ন অভিযানে ১০০, ২১, ১৫ ও ১৪ পিস ইয়াবাসহ গাঁজা উদ্ধার করা হয়। ১১ সেপ্টেম্বর তিনজনকে মাদকসহ আটকের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
১৪ সেপ্টেম্বর পৃথক ঘটনায় দুজনকে মাদকসহ আটকের পর তিন মাস ও এক বছরের কারাদণ্ড এবং একই দিনে গাঁজাসহ আটক আরেকজনকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর কপালিরহাট এলাকায় দুই পিস ইয়াবা ও গাঁজাসহ এক যুবককে আটকের পর তাঁকেও তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আদালতের পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর ২৪ ঘণ্টার অভিযানে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। থানা সূত্রে জানা যায়, তাঁদের মধ্যে পাঁচজন পরোয়ানাভুক্ত, তিনজন নিয়মিত মাদক মামলার আসামি, একজন নিয়মিত মামলার আসামি এবং দুজন মাদক উদ্ধারের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মামলার আসামি। পরদিনও মাদক মামলায় পরোয়ানাভুক্ত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ছাড়া ভাঙারি ব্যবসায়ীকে আটকে রেখে মারধর ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে করা মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। মামলায় স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম আসায় ঘটনাটি আলোচনায় আসে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
১০ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়। ওই সময় পর্যন্ত প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর আটজন আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সদস্য, ২৬ জন পেশাদার চোর, ২৪ জন মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী, বিভিন্ন মামলার ৮৫ আসামি এবং ১২৬ জন পরোয়ানাভুক্ত আসামিসহ মোট ২৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছিল। এটি ১০ মে পর্যন্ত প্রকাশিত হিসাব; পরবর্তী গ্রেপ্তার এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
১৮ জুলাই পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকী ভাণ্ডারিয়া থানাধীন তেলিখালী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরিদর্শনকালে ওসি দেওয়ান জগলুল হাসান উপস্থিত ছিলেন।
ভাণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মামলার আসামি ও আদালতের পরোয়ানাভুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান চলবে। পুলিশের কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।