পুষ্টি বিষয়ে অবহেলা নয়, দরকার সামাজিক সচেতনতা ও এর গুরুত্ব “খাদ্যই হোক ওষুধ, আর ওষুধই হোক খাবার”

[print_bangla]

পুষ্টিবিদ লিনা আকতার-

পুষ্টিবিদ বা ডায়েটিশিয়ান হলো যিনি খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। পুষ্টিবিদ হিসেবে কাজ করা প্রায়শই একজন ডায়েটিশিয়ানের ভুমিকার অনুরূপ। কিন্তু ডায়েটিশিয়ান হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক বিশেষ বিষয়ে প্রশিক্ষণ হওয়া দরকার। উন্নত দেশে একজন ডায়েটিশিয়াকে রেজিস্ট্রিশনকৃত নাম্বার দেয়া হয় কিন্তু দুর্ভাগ্য যে বাংলাদেশে দেয়া হয় না, বিধায় অনেকেই পুষ্টিবিদ বা ডায়েটিশিয়ানকে এ জন্য মূল্যায়ন করতে চায় না। পুষ্টিবিদের ভূমিকা: আধুনিক স্বাস্থ্য সেবায় একজন পুষ্টিবিদ ও ডায়েটিশিয়ানের ভূমিকা অপরিহার্য। তারা হাসপাতাল থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত চেম্বার, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম, ক্যাফেরিয়া পর্যন্ত সকল জায়গায় রোগীদের সেবা উন্নত করতে এবং রোগীর আরোগ্য লাভে রোগীদের পুষ্টির অবস্থা ও সার্বিক সুস্থতা উন্নত করতে সাহায্য করেন। পুষ্টিবিদদের অবদান সরাসরি রোগী পরিচর্যার বাইরেও বিস্তৃত। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস এবং সঠিক পুষ্টির গুরুত্ব সম্পর্কে স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদেরকে যেমন নার্স, ডাক্তারদেরকেও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে এক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে থাকে। একজন পুষ্টিবিদের ক্লিনিক্যাল কাজের পরিবেশ কেমন হয় পুষ্টিবিদ বা ডায়েটিশিয়ানরা মানুষের বয়স, ওজন, উচ্চতা, রোগীর পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে ও শারীরিক অবস্থা ও আর্থিক অবস্থা বুঝে একটি ডায়েট প্ল্যান বা খাদ্য তালিকা তৈরি করে দেন, যাতে রোগ প্রতিরোধ ও সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিন্ত করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া পুষ্টি বিষয়ক বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখালিখি করে ও ভিডিও করে জনস্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি করে পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলে। সমাজে একটি নিদিষ্ট গোষ্ঠীর অপুষ্টি নিরসনে যেমন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী, শিশু, গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ ভাবে সেমিনার, ট্রেনিং করে রোগ আরোগ্য লাভে সহায়তা করে থাকেন। সামাজিক ক্ষেত্রে পুষ্টিবিদ ও ডায়েটিশিয়ান প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা বজায় রাখার জন্য স্কুল, কলেজ, দিবাগত কেন্দ্র, সংশোধনাগার বা কাউন্সেলিং প্রোগামের সাথে যুক্ত হয়ে পুষ্টিগত সেবা দিয়ে থাকেন।
পুষ্টিবিদরা ক্যাফেটিয়া ও রেস্তোরাগুলোতে কিভাবে খাবার রান্না করলে খাবারটি সঠিক পুষ্টি পাওয়া যাবে, খাবারের মেন্যু তৈরিতে এবং খাবার নিরাপদ রাখার কৈৗশল সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া কর্পোরেট সুস্থতা কর্মসূচিতে, পুষ্টি শিক্ষা দিয়ে থাকে। ডায়েটিশিয়ানরা উচ্চ শিক্ষা বা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে যেমন ডিগ্রী অর্জন করে তেমনি দেশের মধ্যে এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে জুনিয়র পুষ্টিবিদ, নার্সি বা স্বাস্থ্য সেবার পেশাদার লোকজনকে ট্রেনিং দিয়ে পুষ্টিগত স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকেন। কর্মস্থলের উপর নির্ভর করে পুষ্টিবিদরা ডাক্তার, নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট সকলের সাথে সহযোগী হয়ে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে কাজ করতে পারেন। দেশে চিকিৎসার পাশাপাশি পুষ্টি বিষয়ে জ্ঞান থাকা অনেক গুরুতপূর্ণ। এ জন্য যে কোন চিকিৎসার পাশাপাশি একজন পুষ্টিবিদের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। আমরা সচরাচর পুষ্টিবিদের কাছে যেতে চাই না, যদি না কোন ডাক্টার পুষ্টিবিদের কাছে যেতে না বলে। আসলে প্রত্যেক ব্যক্তির সুস্থতার জন্য তার খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে জ্ঞান থাকা জরুরী। একজন পুষ্টিবিদ আপনার শরীরের চাহিদা অনুযায়ী আপনার সঠিক খাদ্য তালিকা তৈরি করে দিয়ে থাকে যা বিভিন্ন রোগ থেকে নিরাময় পেতে এবং সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে। তাই আপনার সুস্থ থাকতে এবং রোগের জটিলতা এড়াতে খাবারের রয়েছে এক বিরাট ভুমিকা। দেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সবাইকে একসঙ্গে পুষ্টি সচেতনতাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকর ভুমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। একজন শিশু মায়ের গর্ভে থাকা শুরু করে বড় হওয়া পর্যন্ত পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন হয়। কেননা একজন শিশু বুদ্ধি বিকাশ ও মেধাবী হওয়ার পিছনে একটি স্বাস্থ্যকর ব্যালেন্স ডায়েটের রয়েছে অপরিসীম ভূমিকা। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে বিভিন্ন দেশের মেধাবী ছেলে মেয়েদের সাথে টিকিয়ে থাকতে হলে একটি পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন সবার আগে। তাই একজন ডাক্টারের পাশাপাশি একজন পুষ্টিবিদের শরনাপন্ন হওয়া আপনার একান্ত কাম্য। পুষ্টিবিদ নিয়ে নিয়ে ভুল ধারনা আমাদের দেশে পুষ্টিবিদ নিয়ে ধারনা আছে যে পুষ্টিবিদের কাছে গেলে দামী খাবার খেতে হবে। আসলে ব্যক্তির রুচি, তার জায়গা, আর্থিক অবস্থা বুঝে খাদ্য তালিকা দেয়া হয়। এ ছাড়া আমাদের দেশে অনেকেই বলে থাকে ভালো খাবার খেলেই পুষ্টি পাওয়া যায়। পুষ্টিবিদের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। আসলে ভালো খাবার খেলেই হবে না, রান্নায় যদি ভুল পদ্ধতি ও কৌশল, ভুল সংমিশ্রন ও শোষণ সঠিক না হয় তাহলে ভালো খাবার খেয়েও সম্পূর্ন পুষ্টি হারাতে পারেন। আজকাল বাসা-বাড়িতে পুষ্টিকর খাবারের প্র্যাক্টিস খুব কম, যার কারণে শিশু থেকে শুরু করে একজন বয়স্ক পর্যন্ত অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস গ্রহন করছে যার ফলাফল অপুষ্টি থেকেই রোগ। অনেকের ধারনা পুষ্টিবিদ বা ডায়েটিশিয়ানরা ওজন কমানো, বাড়ানো ও শিশুদেরকে নিয়ে কাজ করে থাকে। এটি সম্পূর্ন ভুল ধারনা। আমরা সকল রোগ নিয়ে কাজ করি। শারীরিক অবস্থা ভেদে কোন খাবার কতটুকু খাবেন, কখন খাবেন, কি উপায়ে খাবেন যদি আপনি না জানেন তাহলে যতই রোগ নিরাময়ের জন্য দৌড়ান না কেন সেটি কখনও স্থায়ী সমাধান পাবেন না। অনেকে আজকাল মিডিয়া জগতে ইউটিউব, ফেসবুকের মাধ্যমে খাবার খান বা ডায়েট করেন যেটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর শরীরের জন্য। কেননা যিনি পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি আপনার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানে না। আবার কোন রোগের খাবার কি খাচ্ছেন বা বাদ দিচ্ছেন বা কোন ওষুধ নিচ্ছেন তা জানে না। তাই আপনার ওষুধ খাবার না হয়ে খাবারকে ওষুধ হিসেবে গন্য করুণ। এ জন্য কোন চিকিৎসক আপনাকে পুষ্টিবিদের কাছে না পাঠালেও আপনাকে পুষ্টিবিদের কাছে যেতে হবে আপনার সুস্থতার জন্য।
আমাদের দেশে মানুষের ধারনা পুষ্টিবিদরা ওষুধ লেখেন না তাই তারা ডাক্তারের মতো নয়। বাস্তবে পুষ্টিবিদকেও শরীরের সমস্ত রোগ সম্পর্কে ধারনা রাখতে হয় এবং মেডিকেল বিষয়ে ধারনা রাখতে হয়। খাদ্যই হোক তোমার ওষুধ এবং ওষুধই হোক তোমার খাদ্য এই বিখ্যাত উক্তিটি হিপোক্রেটিসের। কিন্তু তার আগে বহুশতাব্দী ধরে মানুষ মনে করা হতো আমরা যা খাই তা আমাদের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। এটির প্রমান আগে আমাদের দাদী নানীরা মনে করতো ঘরে তৈরি করা খাবারই সেরা। এজন্য ঘরের একটি কোনায় তারা বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি বাসায় চাষ করতো। নিরাপদ খাদ্য ও মানসম্মত খাদ্য গ্রহনই তারা বিশ্বাস করতো। এতে তাদের খাদ্য সম্পর্কিত স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও অসুস্থতায় ভুগতো কম। আজকাল বাইরে বের হলেই শিশু কিশার কিশোরী থেকে শুরু করে বয়স্ক পর্যন্ত প্রক্রিয়াজাত, ফাস্টফুড, এনার্জি ড্রিংকস, ফাইড ফুডগুলো খাচ্ছেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য মোটেই ভালো নয়। বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে যেখানে শুধুমাত্র একটি জনগোষ্ঠী পুষ্টি জ্ঞান ও কৌশল সম্পর্কে অবগত তাদের সাধারণ রোগ হওয়ার ঝুঁকি কম। বিশেষ করে নারী, শিশু, কিশোর-কিশোরী ও গর্ভবতী মহিলা। তাদের সুস্থ বৃদ্ধি, বিকাশে তেমন সমস্যা হয় না। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও উন্নত।
চিকিৎসকের ভুমিকা-রোগীর পুষ্টি সম্পর্কিত সমস্যা নিরসনে চিকিৎসকের সাড়াদানে সহায়তা করা খুব গুরুত্বপূর্ন। রোগীরা প্রায়শই পুষ্টি সম্পর্কিত বিষয়সমূহ এবং বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সেবা চাহিদা মেটাতে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য একজন চিকিৎসকের কাছে যান। চিকিৎসরা সাধারণত মেডিকেলে পুষ্টি বিষয়ে কম প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে যেখানে একজন পুষ্টিবিদ বা ডায়েটিশিয়ানরা অনেক বেশি প্রশিক্ষনার্থী। দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে ও চিকিৎসায় পুষ্টির ভুমিকা সম্পর্কে ততটা না জানায় চিকিৎসরা হয়তো জানতে পারেন না কখন একজন পুষ্টিবিদের দরকার। পুষ্টি শিক্ষার উন্নতির জন্য চিকিৎসকদের অবশ্যই রোগীদের যথাযথ রেফার করা। ভবিষ্যতে চিকিৎসকরা রোগীদের পুষ্টি চাহিদা আরো ভালো ভাবে পূরণ করতে পুষ্টিসেবাকে গুরুত্ব ও মূল্যায়ন করা উচিত।

পুষ্টিবিদ লিনা আকতার,
রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পুষ্টি বিষয়ে অবহেলা নয়, দরকার সামাজিক সচেতনতা ও এর গুরুত্ব "খাদ্যই হোক ওষুধ, আর ওষুধই হোক খাবার"

৩০ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top