প্রতিবন্ধকতা নয়, দৃঢ় মনোবলই আসল পরিচয়: পার্বতীপুরের নাজমুজ্ সাকিবের অনন্য সংগ্রামী জীবন

[print_bangla]

মেনহাজুল ইসলাম তারেক, দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি:

মানুষের সাফল্যের পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের অভাব—এ কথার বাস্তব উদাহরণ দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার তরুণ নাজমুজ্ সাকিব। জন্মগতভাবে দুই হাতের কবজি ও ডান পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ না থাকলেও জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের স্বপ্নের পথে।

পার্বতীপুর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর সরদারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সাকিব একটি সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকট—দুই প্রতিকূলতাকেই সঙ্গী করে বেড়ে উঠলেও কখনো হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি তিনি। বরং শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে বেঁছে নিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী। মন্মথপুর (২) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের মাধ্যমে তার সাফল্যের যাত্রা শুরু হয়। পরে মন্মথপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করেন। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মন্মথপুর আইডিয়াল ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ-৪.৮৩ পেয়ে উত্ত্বীর্ণ হওয়ার পর বর্তমানে তিনি পার্বতীপুর সরকারি কলেজে ডিগ্রী তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত রয়েছেন।

লেখাপড়ার পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক কাজেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন এই তরুণ। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সভা, সেমিনার ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে তিনি প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মর্যাদা বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরছেন।

স্থানীয়দের মতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারের কারণে সাকিব ইতোমধ্যেই এলাকায় একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তার আত্মপ্রত্যয় অনেক তরুণের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।

তার পারিবারিক পটভূমিও সংগ্রাম ও সাফল্যের মিশেলে গড়া। বড় ভাই মোঃ রোকনুজ্জামান রোকন বর্তমানে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। অপর ভাই মোঃ আখিরুজ্জামান হৃদয় মেকানিক্যাল প্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে বর্তমানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শেষ বর্ষে অধ্যয়ন করছেন এবং একই সঙ্গে তিনি আবেদিন গ্রুপের একটি ট্রাক্টর কোম্পানিতে দায়িত্ব পালন করছেন।

সন্তানের প্রসঙ্গে বাবা আজিমুদ্দীন সরদার বলেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সাকিব কখনো পিছিয়ে পড়ার কথা ভাবেনি। প্রতিটি অর্জনের পেছনে তার কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, সে একদিন সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”

নিজের স্বপ্ন ও সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে নাজমুজ্ সাকিব বলেন, “প্রতিদিনই আমাকে নানা ধরনের বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তবে আমি বিশ্বাস করি, ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। আমি সমাজের কল্যাণে কাজ করতে চাই এবং বিশেষ করে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে চাই।”

তিনি আরও জানান, কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে তিনি শুধু নিজের জীবনকে স্বাবলম্বী নয় বরং সমাজের উন্নয়নমূলক কাজে আরও কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারবেন।

সচেতন মহলের অভিমত, নাজমুজ্ সাকিবের জীবনকাহিনী অধ্যবসায়, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের এক জীবন্ত উদাহরণ। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে জয় করে তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের প্রকৃত শক্তি তার শারীরিক সক্ষমতায় নয় বরং দৃঢ় মনোবল, পরিশ্রম এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকার মধ্যেই নিহিত।

পার্বতীপুরের এই তরুণ আজ শুধু নিজের পরিবারের নয়, সমগ্র সমাজের জন্যই আশার প্রতীক ও অনুপ্রেরণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন।

 

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ প্রকাশিত

প্রতিবন্ধকতা নয়, দৃঢ় মনোবলই আসল পরিচয়: পার্বতীপুরের নাজমুজ্ সাকিবের অনন্য সংগ্রামী জীবন

০২ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top