বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সবুজ হোক ধরার প্রাণ

[print_bangla]

বিধান চন্দ্র সান্যাল

মহাজাগতিক শূন্যতার মাঝে ঝুলে থাকা নীল-সাদা গ্রহ-আমাদের এই আদরের পৃথিবী। আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে এক উত্তপ্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে শীতল হয়ে ওঠা এই ধূলিকণায় প্রাণের প্রথম স্পন্দন জেগে ছিল জলের গভীরে। সেই অণুজীব থেকে শুরু করে আজকের এই বিশাল জীববৈচিত্র্য, তার মূলে রয়েছে এক জাদুকরী সবুজ কণা-ক্লোরোফিল। সূর্যের ফোটন কণা আর মাটির খনিজ জলের সাথে কার্বন ডাই অক্সাইডের রাসায়নিক রূপান্তর ঘটিয়ে, এই সবুজই তো আমাদের নিঃশ্বাসে অক্সিজেন ঢেলে প্রাণ টিকিয়ে রেখেছে।আজ সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে, কংক্রিটের ইট-কাঠ আর পাথরের জঙ্গল গ্রাস করেছে প্রকৃতির সবুজ চাদর।
বিজ্ঞানের জয়জয়কার আর প্রযুক্তির দাপটে যন্ত্রের বিষাক্ত ধোঁয়া আর কার্বনের চাদরে ঢেকে যাচ্ছে আমাদের বায়ুমণ্ডল। গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধিতে গলছে মেরুর বরফ, সমুদ্রের জলস্তর উঠছে ফুলে ফেঁপে। বৃক্ষ নিধনের এই নিষ্ঠুর খেলায় আজ বিপন্ন পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র।
প্রকৃতি তার নিজস্ব ভারসাম্য হারাচ্ছে, দাবানল আর খরার রুদ্ররূপে যার চরম মূল্য চোকাচ্ছে সমগ্র জীবজগৎ। তবু, আশার আলো এখনও নিভে যায়নি। সালোক সংশ্লেষণের সেই প্রাচীন ও অমোঘ নিয়মেই লুকিয়ে আছে মুক্তির পথ। মৃত্তিকার গভীরে প্রোথিত শিকড় আর প্রসারিত পাতার ক্যানভাসে প্রকৃতি আজও আমাদের আহ্বান করে। বিজ্ঞান আজ আমাদের আঙুলে তুলে দিয়েছে নবায়নযোগ্য শক্তির চাবিকাঠি-সৌর প্যানেলের নীলচে কাচ আর বায়ুকলের ঘূর্ণমান পাখা।
২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের থিম হলো “প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।” (ইংরেজি: “Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.”) জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) অধীনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানের ওপর ভিত্তি করে এবারের দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। প্রতি বছর ৫ই জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস (WED) পালন করা হয়। ১৯৭২ সালে মানব পরিবেশ বিষয়ক স্টকহোম সম্মেলনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এটি প্রতিষ্ঠা করে। পরিবেশের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। কার্বন ডাইঅক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্রিনহাউস গ্যাসের অতিরিক্ত নির্গমনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পরিণতি হলো: মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। পরিবেশ বাঁচাতে বিশ্বের উদ্যোগগুলো মূলত বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাস, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক চুক্তি, সরকারি নীতি এবং ব্যক্তিগত সচেতনতা-এই তিনটি স্তরে কাজ করা হচ্ছে। বৈশ্বিক ও স্থানীয় পর্যায়ে যেসব প্রধান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা  হলো-
১. বিশ্বের প্রায় সব দেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি\ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ধরে রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
২. জাতিসংঘের ১৫ ও ১৩ নম্বর লক্ষ্য সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং স্থলজ ও জলজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষার কথা বলে। 
৩. কয়লা ও তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌরশক্তি , বায়ুশক্তি  এবং জলবিদ্যুতের ব্যবহার বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। 
৪. বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) ব্যবহার এবং হাইড্রোজেন জ্বালানি প্রযুক্তির উন্নয়ন বিশ্বজুড়ে দূষণ কমানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। 
৫. জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বন উজাড় রোধ এবং নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টির ওপর জোর দিচ্ছে। ভারতে ‘নগর বন যোজনা’ এবং বিভিন্ন দেশে ‘সিড বল’  প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম অঞ্চলে গাছ লাগানো হচ্ছে।
৬. বাঘ, ডলফিন ও গণ্ডারের মতো বিপন্ন প্রাণী রক্ষায় চলছে বিশেষ প্রকল্প। 
৭. একবার ব্যবহার যোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণে বিশ্বের বহু দেশ আইন পাস করেছে। সাগরের প্লাস্টিক পরিষ্কার করতে রোবোটিক ও চুম্বক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। 
৮. বিশ্বের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী আপনিও ব্যক্তিগত ভাবে প্রতিদিনের জীবনে কিছু ছোট উদ্যোগ নিতে প্রচেষ্টা করা। 
৯. প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে কাপড়ের ব্যাগ বা থলে ব্যবহার করুন। অপচয় রোধ করুন এবং পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার সীমিত করবার অনুপ্রেরণা দেওয়া। 
১০. ছোট দূরত্বের জন্য হাঁটা বা সাইকেল চালানো অভ্যাস করতে উৎসাহিত করা। 
তবে পরিবেশ রক্ষায় সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। 
আমরা যদি প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটাতে পারি, তবেই ফিরবে সুদিন।
আসুন, তবে আজ নতুন করে প্রতিজ্ঞা করি। জীবদেহের মাইটোকন্ড্রিয়ার মতো প্রতিটি কোষের শক্তি হয়ে উঠুক এই সবুজায়ন। বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিয়ে, আলোক-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ধরিত্রীর বুক আবার ভরে উঠুক স্নিগ্ধ, সতেজ অরণ্যে। এই সবুজ শুধু গাছের পাতা নয়, এটি হলো সমগ্র জীব জগতের বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র, প্রাণ শক্তির স্পন্দন। বিজ্ঞান ও প্রকৃতির মেলবন্ধনে, মৃত্তিকার প্রতিটি কণা হয়ে উঠুক উর্বর। প্রতিটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরা ফিরিয়ে আনব বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য। সবুজ হোক আমাদের চিন্তাধারা, সবুজ হোক আমাদের ভবিষ্যৎ। দূষণমুক্ত, প্রাণবন্ত এই নীল গ্রহের প্রতিটি প্রান্তে আবার বেজে উঠুক জীবনের জয়গান-সবুজ হোক ধরার প্রাণ। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ প্রকাশিত

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সবুজ হোক ধরার প্রাণ

০৫ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top