
বিধান চন্দ্র সান্যাল
প্রযুক্তি ও মানব জীবনের মেলবন্ধন আজ এক অবিচ্ছেদ্য আখ্যানে পরিণত হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের পাথরের হাতিয়ার থেকে শুরু করে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-প্রযুক্তির প্রতিটি ধাপ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সমাজ, অর্থনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মানুষের অস্তিত্বের সংকট ও সম্ভাবনা উভয়কেই ধারণ করে আবর্তিত হচ্ছে প্রযুক্তিময় এই বিশ্ব। মানুষ স্বভাবতই আবিষ্কার প্রিয়। অজানাকে জানার ও অসম্ভবকে সম্ভব করার অদম্য ইচ্ছাই মানব জাতিকে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উদ্বুদ্ধ করেছে। গ্রিক শব্দ ‘টেকনোলোজিয়া’ (Technologia) যার অর্থ কোনো শিল্পের প্রয়োগিক দিক, তা আজ আমাদের জীবনের প্রতিটি কোণায় শিকড় গেড়েছে। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শুধু মানুষের দৈনন্দিন কাজ সহজই করেনি, বরং বিশ্বকে এক বৈশ্বিক গ্রামে (Global Village) রূপান্তরিত করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান ও চমকপ্রদ প্রভাব দেখা যায় যোগাযোগ ব্যবস্থায়। চিঠির যুগ পেরিয়ে আজ ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, এবং সোশ্যাল মিডিয়া (যেমন-ফেসবুক, টুইটার) মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। ভৌগোলিক দূরত্ব আজ আর কোনো বাধা নয়। তবে এর বিপরীতে একটি মনস্তাত্ত্বিক সংকটও তৈরি হচ্ছে। মুখোমুখি যোগাযোগের (Face-to-face interaction) উষ্ণতা হারিয়ে মানুষ ক্রমশ ভার্চুয়াল জগতে বন্দি হয়ে পড়ছে। কৃত্রিম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে ব্যক্তিগত একাকীত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যাগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।
মানব জীবনকে দীর্ঘায়িত করতে এবং রোগের নিরাময়ে প্রযুক্তির অবদান অনস্বীকার্য। উন্নত রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা (Diagnostic tools), এমআরআই (MRI), এক্স-রে, লেজার সার্জারি এবং রোবোটিক চিকিৎসার ফলে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি দূরবর্তী স্থানে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া, যাকে ‘টেলিমেডিসিন’ (Telemedicine) বলা হয়, স্বাস্থ্য সেবাকে আরও সুলভ ও সহজলভ্য করে তুলেছে। তা সত্ত্বেও, উন্নত চিকিৎসার উচ্চমূল্য এবং প্রযুক্তি নির্ভর স্বাস্থ্য সেবার অসম বণ্টন আজও সমাজের একটি বড় অংশের জন্য উদ্বেগের কারণ।
শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রবেশ এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে। প্রথাগত শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়ে ই-লার্নিং, ডিজিটাল লাইব্রেরি, এবং অনলাইন কোর্সগুলোর (MOOCs) মাধ্যমে জ্ঞান এখন সবার হাতের মুঠোয়। স্মার্ট ক্লাসরুম এবং ই-বুকের ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী ও ইন্টারেক্টিভ করে তুলছে। জ্ঞান আহরণের এই সহজলভ্যতা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে।
প্রযুক্তি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কলকারখানায় অটোমেশন এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার কাজকে দ্রুত ও নির্ভুল করেছে। তবে এটি শ্রমজীবী মানুষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। কায়িক শ্রমের প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান হারানোর বা চাকরিচ্যুতির ভয় তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি মানুষকে নতুন ধরনের পেশার সন্ধান দিলেও, এর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা (Digital literacy) অর্জন করা প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফলে শিল্পায়ন ও নগরায়ণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রকৃতির ওপর। কার্বন নিঃসরণ, বৈদ্যুতিক বর্জ্য (E-waste) এবং পরিবেশ দূষণ আজ পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি। যদিও বিজ্ঞানীরা পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি (Green Technology) ও নবায়ন যোগ্য শক্তির (Renewable Energy) ওপর জোর দিচ্ছেন, তবুও প্রযুক্তি ও প্রকৃতির মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ক্রিশ্চিয়ান লুইস ল্যাঞ্জে বলে ছিলেন-“প্রযুক্তি একটি চমৎকার সেবক, কিন্তু ভয়ংকর প্রভু।” (Technology is a useful servant, but a dangerous master)। আজ মানুষ নিজের অজান্তেই ডিজিটাল ডিভাইসের দাসত্বে পরিণত হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন, অনলাইন গেম ইত্যাদির প্রতি আসক্তি মানুষের মনোযোগের পরিধি (Attention span) কমিয়ে দিচ্ছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ঘুম ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তথ্য সুরক্ষার অভাব (Data privacy) এবং সাইবার ক্রাইম মানবজীবনের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
প্রযুক্তি ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান এবং তা অনিবার্য। আগামীর পৃথিবী হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং ইন্টারনেটের আরও উন্নত সংস্করণের। কিন্তু প্রযুক্তির এই মহাসমুদ্রে ভেসে থাকার জন্য আমাদের মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং আবেগের চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন মানুষের জীবনকে উন্নত করার স্বার্থে হয়, মানুষের মানবিক সত্তাকে ধ্বংস করার জন্য নয়। পরিশেষে বলা যায়, প্রযুক্তি এবং মানব জীবন একই মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ। প্রযুক্তি হলো এক মহাশক্তি, যা মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে, আবার নতুন কোনো দিগন্তও উন্মোচন করতে পারে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে একটি দুর্দান্ত হাতিয়ার। তবে এটিকে কীভাবে ব্যবহার করব, তার সিদ্ধান্ত মানব জাতিকেই নিতে হবে। প্রযুক্তি ও মানব জীবনের মেলবন্ধনে প্রয়োজন এক বিবেকবান ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যাতে উন্নয়নের পাশাপাশি মানবতার মূল সুরটি অক্ষুণ্ণ থাকে।
তথ্যসূত্র-প্রযুক্তি বিষয়ক প্রবন্ধ-eSaral থেকে সংগৃহীত।
প্রযুক্তি এবং মানব জাতির ওপর এর প্রভাব- StudyCorgi। (৫ জানুয়ারি, ২০২৪)। StudyCorgi থেকে সংগৃহীত।
একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তি: তথ্যমূলক প্রবন্ধ – EduBirdie। EduBirdie থেকে সংগৃহীত।
দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির গুরুত্ব-upGrad। (৬ মে, ২০২৬)।
