মঙ্গলবার ২৮শে জুলাই, ২০২৬ ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩

দুই বাংলার মৈত্রী বন্ধনে আকাশবাণী কলকাতা: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

[print_bangla]

বিধান চন্দ্র সান্যাল-

ভৌগোলিক সীমারেখা কখনো ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিলনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের মাধ্যমে বাংলা ও বাঙালি বিভক্ত হলেও, অন্তরে তারা এক অবিভাজ্য সত্ত্বা। এই দুই বাংলার মানুষের মননকে একই সুতোয় গাঁথার ক্ষেত্রে যে মাধ্যমটি যুগ যুগ ধরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, তা হলো বেতার বা রেডিও। আর এই ক্ষেত্রে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে আকাশবাণী কলকাতা। ‘আকাশবাণী কলকাতা’ কেবল একটি সম্প্রচার মাধ্যম নয়, এটি দুই বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ এবং মৈত্রী বন্ধনের এক শক্তিশালী সেতু।
১৯২৭ সালে কলকাতা বেতার কেন্দ্রের যাত্রা শুরুর পর থেকেই বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ সেকালের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল এই বেতার কেন্দ্র। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) এবং বর্তমান বাংলাদেশের অজস্র শ্রোতাদের কাছে আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠান ছিল অপরিহার্য। সংবাদ, নাটক, রবীন্দ্র সংগীত, এবং কথিকা-সবকিছুই দুই পারের বাঙালিদের এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক বলয়ে আবদ্ধ করে ছিল।
দুই বাংলার মৈত্রী ও আত্মিক সম্পর্কের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এক অনন্য অধ্যায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আকাশবাণী কলকাতা অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুক্তিকামী মানুষদের সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাতে এই বেতার কেন্দ্র নিয়মিত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও দেশাত্মবোধক গান প্রচার করত। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি গোপন স্টুডিও থেকে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ তার কার্যক্রম পরিচালনা করত, যা আকাশবাণী কলকাতার কারিগরি সহায়তায় সম্প্রচারিত হতো। পাকিস্তানি বাহিনীর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের মানুষ কান পাতত রেডিওর পর্দায়, আর আকাশবাণী হয়ে উঠেছিল মুক্তির বার্তার প্রতীক। এই ঐতিহাসিক অবদান দুই বাংলার মৈত্রী বন্ধনকে এক চিরস্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। দুই বাংলার মানুষের গভীর সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট অল ইন্ডিয়া রেডিওর পক্ষ থেকে চালু করা হয় বিশেষ পরিষেবা ‘আকাশবাণী মৈত্রী’। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় এই আন্তঃসীমান্ত রেডিও পরিষেবার উদ্বোধন করেন। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় এক হাজার মেগাওয়াট সম্পন্ন ট্রান্সমিটার বসানোর ফলে এর সম্প্রচার পরিসর বৃদ্ধি পায়। এর প্রধান লক্ষ্যই হলো-সীমান্তের উভয় পাশের বাঙালি শ্রোতাদের জন্য একই সঙ্গে বাংলা সংবাদ, আলোচনা, লোক সংগীত ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা। আকাশবাণী মৈত্রী ও বাংলাদেশ বেতারের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠান নির্মাণ ও বিষয়বস্তু আদান-প্রদান দুই দেশের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনকে আরও বহুমাত্রিক করেছে।
বাংলা ভাষার বিশুদ্ধ উচ্চারণ, সাহিত্য পাঠ এবং মননশীল আলোচনার ক্ষেত্রে আকাশবাণী কলকাতা বরাবরই আদর্শ স্থানীয়। দুই বাংলার প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের আলোচনা এবং সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড নিয়মিত এই মাধ্যমে প্রচারের ফলে ভাষা ও সাহিত্যের এক অভিন্ন চর্চাক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। দুই বাংলার তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজেদের সমৃদ্ধ সাহিত্যের ঐতিহ্য পৌঁছে দিতে এই বেতার কেন্দ্রগুলি নিয়মিত বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল ও ইন্টারনেটের যুগে বেতারের রূপ ও মাধ্যম বদলে গেছে। আজ শুধু ট্রানজিস্টর বা রেডিও সেট নয়, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষ আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠান শুনতে পাচ্ছে। ভবিষ্যতে দুই বাংলার মৈত্রী বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে আকাশবাণী কলকাতাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, দুই বাংলার লোকসংস্কৃতি, যা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের ধারক, তা বেশি করে প্রচার করা প্রয়োজন। বাউল, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, ভাওয়াইয়া ইত্যাদি লোকসংগীতের নিয়মিত আদান-প্রদান দুই পারের গ্রামীণ সংস্কৃতিকে কাছাকাছি নিয়ে আসবে।
দ্বিতীয়ত, তরুণ প্রজন্মের সম্পৃক্ততা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। দুই বাংলার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিতর্ক, কুইজ ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তা বেতারে সম্প্রচার করা যেতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে মৈত্রীর বীজ রোপিত হবে।
তৃতীয়ত, সমাজ সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, যেমন-পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক আলোচনা যৌথ ভাবে সম্প্রচার করা যেতে পারে। এতে দুই প্রতিবেশী দেশের সামাজিক ও উন্নয়নমূলক সমস্যা সমাধানে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব গড়ে উঠবে।
চতুর্থত, তথ্য প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও পডকাস্টের মাধ্যমে আকাশবাণী কলকাতার সমৃদ্ধ আর্কাইভ-যেখানে বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কণ্ঠস্বর ও গান সংরক্ষিত আছে-তা দুই বাংলার শ্রোতাদের জন্য উন্মুক্ত করা যেতে পারে।
আকাশবাণী কলকাতা কেবল শব্দতরঙ্গের এক মাধ্যম নয়, এটি দুই বাংলার কোটি বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন। সুদীর্ঘ কালের ইতিহাস, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষরা দিনগুলোর আত্মিক টান এবং বর্তমানের ‘আকাশবাণী মৈত্রী’ সবকিছু মিলিয়ে এই বেতার কেন্দ্রটি দুই বাংলার মানুষের মধ্যে যে মেলবন্ধন তৈরি করেছে, তা অনন্য ও অতুলনীয়। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আকাশবাণী কলকাতা আগামী দিনগুলোতেও দুই বাংলার মৈত্রী, সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের ধারাকে সাফল্যের সঙ্গে অক্ষুণ্ণ রাখবে-এটাই অখণ্ড বাংলার সমস্ত সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের প্রত্যাশা। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দুই বাংলার মৈত্রী বন্ধনে আকাশবাণী কলকাতা: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

২১ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top