শুক্রবার ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩

বরিশালকে অর্থনৈতিক হাব বানাতে বিডিজেএর ভিশন-২০৫০

[print_bangla]

এমএফএইচ রাজু | ঢাকা | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বরিশাল অঞ্চলকে শুধু শস্যভান্ডার নয়, দক্ষিণ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি ভিশন বরিশাল-২০৫০ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিডিজেএ)। একই সঙ্গে পদ্মা সেতুকে ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে শিল্প, জ্বালানি, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিডিজেএ আয়োজিত আগামীর বরিশাল: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয় শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এসব কথা বলা হয়। সেমিনারে বরিশাল অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন বক্তারা।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডিজেএর উপদেষ্টা ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ বরিশাল বিভাগ থেকে আসে এবং এ অঞ্চলের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবছর দেশের প্রায় ১৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ পর্যটক কুয়াকাটা, ভাসমান পেয়ারা বাজার ও সুন্দরবন ভ্রমণ করেন।

তবে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের অভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান ৩০ শতাংশের বেশি হলেও বরিশাল অঞ্চলে তা ২ শতাংশেরও কম। বিসিক শিল্পনগরী থাকলেও মূলধনের সংকট ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

এ বাধা দূর করতে ভোলার গ্যাসসম্পদসহ দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর তাগিদ দেওয়া হয়। পাশাপাশি উপকূলের ২ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে লবণাক্ততার কারণে ধানের উৎপাদন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার এবং সুপেয় পানির সংকট তৈরির ঝুঁকির কথাও তুলে ধরা হয়।

সেমিনারে বরিশাল অঞ্চলের শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিডিজেএর পক্ষ থেকে ১০ দফা কৌশলগত সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ, সুপেয় পানি ও ডেল্টা অভিযোজনের জন্য পৃথক উপকূলীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয় গঠন, ঢাকা-পদ্মা সেতু-বরিশাল-পটুয়াখালী-পায়রা রেল সংযোগ চালু এবং ভাঙ্গা-কুয়াকাটা সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা।

পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডোর ও লজিস্টিক হাব গড়ে তোলার পাশাপাশি ধান, মাছ, পেয়ারা ও আমড়ার মূল্য সংযোজনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোল্ড চেইন এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।

এ ছাড়া নদীভাঙন, প্লাবন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ, পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ ড্রেজিং ও ব্লু-ইকোনমি সম্প্রসারণের কথা বলা হয়।

বরিশাল, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, বরগুনা ও সুন্দরবনকে যুক্ত করে পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা, তরুণদের ঢাকামুখী প্রবণতা কমাতে আইটি হাব, কারিগরি ও মেরিন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জলবায়ু গবেষণাকেন্দ্রে রূপান্তরের সুপারিশ করা হয়।

সবশেষে ভিশন-২০৫০ বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, অপার সম্ভাবনা থাকার পরও উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানা স্থাপনে পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল অঞ্চল। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তৈরির অন্যতম শক্তি পানি। পানির ওপর দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে। বরিশাল বিভাগজুড়ে বিপুল পরিমাণ পানি থাকার পরও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, আগামী দিনে উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘিরে সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তা সম্মিলিতভাবে বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।

প্রধান আলোচক তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান বলেন, বরিশাল অঞ্চলের উন্নয়ন ভাবনার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে ভালো রাজনীতিবিদ ও দক্ষ নেতৃত্ব তৈরির দিকেও নজর দিতে হবে। ভালো নেতৃত্ব তৈরি না হলে ভবিষ্যতে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হবে।

বিশেষ অতিথি নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান বলেন, সবাই উন্নয়নের কথা বললেও সমন্বয় ও ঐক্যের ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে বরিশালের উন্নয়নে সবার ঐক্য প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাস্তাঘাট ও সেতুসহ যেসব দাবি উঠেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন নয়। তবে সুনির্দিষ্ট ও জরুরি দাবিগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তুলে ধরতে হবে এবং সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে অতীতে বরিশালের উন্নয়নের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন এ অঞ্চলের মানুষের সামনে বড় সুযোগ এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারলে সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব।

তিনি বরিশাল অঞ্চলের সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনার আহ্বান জানান। পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে এলাকাকে ক্লিন, গ্রিন ও সেফ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, পটুয়াখালীতে এক্সপার্ট প্রসেসিং জোনের কাজ এগিয়ে চলছে এবং বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যে যোগাযোগ করছেন। এটি চালু হলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতির গতিপথ বদলে যেতে পারে। এজন্য ছয় লেনের সড়ক এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবুর রহমান সরোয়ার, ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম জামাল, পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল আমিন দুলাল এবং পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।

এ ছাড়া বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আকন কুদ্দুস, সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ও বিডিজেএর উপদেষ্টা মো. নিজাম উদ্দিন, শ্যামলীর ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার, বরিশাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম খসরু, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, বিডিজেএর উপদেষ্টা আবু জাফর সূর্য, পটুয়াখালী জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি বদরুল আলম নাবিল এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কে এম শরিয়াতুল্লাহ প্রমুখ বক্তব্য দেন।

বিডিজেএর সভাপতি মাহবুব সৈকতের সভাপতিত্বে সেমিনার সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সানবির রুপল ও নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সেমিনার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক কাজী জেবেল।

অনুষ্ঠানে বিডিজেএর সিনিয়র সহ-সভাপতি এম. এম. বাদশাহ, সহ-সভাপতি কে জেড সোহেল, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব জুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন, অর্থ ও দপ্তর সম্পাদক ফাহিম মোনায়েম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইউসুফ বাচ্চু, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিন্টুসহ নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের সামনে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। এখন শিল্প, জ্বালানি ও কর্মসংস্থান স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত করতে সরকার, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। বাস্তবমুখী আঞ্চলিক পরিকল্পনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বরিশাল অঞ্চল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন অনুঘটক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বরিশালকে অর্থনৈতিক হাব বানাতে বিডিজেএর ভিশন-২০৫০

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top