কৃষক, কৃষি ও সুশাসন (টেকসই উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি)

[print_bangla]

ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ-

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। আর এই কৃষির প্রাণশক্তি কৃষক। তাঁদের শ্রম, মেধা ও নিষ্ঠায় উৎপাদিত খাদ্য দেশের কোটি মানুষের আহার জোগায় এবং জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে। তাই কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন এবং সুশাসনের কার্যকর সমন্বয় একটি সমৃদ্ধ, উৎপাদনশীল ও টেকসই বাংলাদেশ গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষিও ক্রমশ আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে উঠছে। উন্নত বীজ, কৃষি গবেষণা, যান্ত্রিকীকরণ, ডিজিটাল সেবা এবং জলবায়ু সহনশীল চাষাবাদের মাধ্যমে দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের আয় উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা, দক্ষ কৃষি প্রশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
কৃষি উন্নয়নে সুশাসনের গুরুত্ব:
সুশাসন একটি দেশের উন্নয়নকে টেকসই ও জনকল্যাণমুখী করার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কৃষি খাতে এর যথাযথ চর্চা নিশ্চিত করা গেলে সরকারি সহায়তা ও উন্নয়ন কর্মসূচির সুফল আরও কার্যকরভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। কৃষি ভর্তুকি, সার, বীজ, সেচ সুবিধা, কৃষিঋণ ও কৃষিযন্ত্র বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কৃষিসেবা সহজলভ্য করা, কৃষকের তথ্যপ্রাপ্তি বাড়ানো এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এতে কৃষক উপকৃত হবেন, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে এবং কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচির প্রতি জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
সরকারের কৃষি বান্ধব নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণ থেকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জনস্বার্থ, দক্ষতা ও জবাবদিহিকে গুরুত্ব দেওয়া হলে কৃষি উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন:
কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারদরের ওঠানামা এবং সংরক্ষণসুবিধার সীমাবদ্ধতা অনেক সময় কৃষকের প্রত্যাশিত আয় অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অন্য দিকে, উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দামের ব্যবধানও বাজার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
এ পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ সহজ করা, সংরক্ষণাগার ও হিমাগারের সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষক সমবায় গঠন এবং সরাসরি বাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য বাজারতথ্য সরবরাহ, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ কর্মসূচিতে প্রকৃত কৃষকের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তার জন্যও সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপণ্য প্রাপ্তির সুযোগ বাড়বে। ফলে কৃষি ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষিসেবার সম্প্রসারণ:
কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক চাষাবাদের বিকল্প নেই। উন্নত জাতের বীজ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি এবং সময়োপযোগী কৃষি পরামর্শের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে ফলন বাড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষিবিদ এবং মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁদের বাস্তব সমস্যা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ডিজিটাল কৃষি সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, বাজারদর ও আধুনিক চাষাবাদ সম্পর্কে তথ্য সহজেই কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কৃষিসেবার মান আরও উন্নত হবে।
জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও কৃষি জমি সংরক্ষণ:
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও তাপমাত্রার পরিবর্তন কৃষি উৎপাদনকে প্রভাবিত করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশ বান্ধব চাষাবাদ পদ্ধতির সম্প্রসারণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষি জমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অপরিকল্পিত ভাবে ফসলি জমি ভরাট, উর্বর মাটির অপসারণ এবং জলাশয় ধ্বংসের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কারণ কৃষিজমি শুধু উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনধারণের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ বান্ধব কৃষি এবং বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষিজমি সংরক্ষণ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষির উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। কৃষকের মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তা কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদনকারী নন; তিনি দেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম রূপকার। অথচ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলের রোগবালাই এবং বাজারদরের পরিবর্তনের কারণে কৃষককে প্রায়ই আর্থিক ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়।
তাই সহজ শর্তে কৃষিঋণ, প্রয়োজন ভিত্তিক সরকারি সহায়তা, কার্যকর ফসলবিমা এবং দুর্যোগকালীন সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষিকে লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়ানো গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কৃষক, কৃষি ও সুশাসন (টেকসই উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি)

২৮ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top