
বিধান চন্দ্র সান্যাল-পশ্চিমবঙ্গ, ভারত-
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রবহমান এক নদীর মতো, যা বঙ্গীয় জনমানসের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও দর্শনের প্রতিফলন ঘটায়। লোকায়ত বিশ্বাস, ধর্মীয় সমন্বয়, এবং আধুনিক মনন-এই তিনে মিলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এক সুদীর্ঘ ও গৌরবময় ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার সূত্রপাত ঘটে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হলো বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত ‘চর্যাপদ’। এই পদাবলিগুলোতে একদিকে যেমন বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব নিহিত ছিল, অন্যদিকে তেমনি ফুটে উঠেছিল তৎকালীন বাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, নদীমাতৃক ভূদৃশ্য এবং সমাজচিত্র। চর্যাপদের মাধ্যমেই প্রথম বাংলা ভাষার নিজস্ব স্বকীয়তা ও কাব্যরূপ প্রকাশিত হয়।
চর্যাপদের পরবর্তী সময়কাল, অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমাংশকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, এই সময়টি ছিল মূলত রূপান্তরের। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের মাধ্যমে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ধর্ম। তবে ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও, মঙ্গলকাব্যগুলোতে তৎকালীন সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির এক নিখুঁত দর্পণ প্রতিফলিত হয়েছে। চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল কিংবা ধর্মমঙ্গল কাব্যের চরিত্রগুলোর মধ্যে বাঙালি জীবনের চিরন্তন সংগ্রাম ও লৌকিক বিশ্বাসের মেলবন্ধন ঘটেছে। মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো বৈষ্ণব পদাবলি। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাসের পদাবলিতে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা রূপান্তরিত হয়েছে মানবাত্মার চিরন্তন বিরহ ও মিলনের আকুলতায়। এছাড়া, সুলতানি ও নবাব আমলে রামায়ণ ও মহাভারতের মতো মহাকাব্যগুলোর অনুবাদ সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করে। আরাকান রাজসভার কবি আলাওল বা দৌলত কাজীর রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান বাংলা সাহিত্যকে এক ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত করে।
উনিশ শতকের ঊষালগ্নে ব্রিটিশ শাসন ও ইউরোপীয় শিক্ষার সংস্পর্শে বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হাত ধরে বাংলা গদ্যের যে যাত্রা শুরু হয়ে ছিল, তা পূর্ণতা পায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক উপন্যাস এবং তাঁর রচিত ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে এক মহা প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
এই নবজাগরণের মধ্যগগনে আবির্ভূত হন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর প্রতিভার স্পর্শে বাংলা সাহিত্য বিশ্বমঞ্চে এক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, চিত্রশিল্প—সব শাখাতেই তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি কথা সাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বাঙালি পাঠককুলের মন জয় করেন। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহের সুর নিয়ে আসেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘বিষের বাঁশি’ তৎকালীন পরাধীন ভারতে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের মনে মুক্তির আগুন জ্বালিয়ে দেয়। নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির এক অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। একই সময়ে বাংলা কাব্যে ‘কল্লোল’ ও ‘সবুজপত্র’ গোষ্ঠীর মাধ্যমে নতুন আধুনিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু এবং বিষ্ণু দে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার মূল ভিত্তি স্থাপন করেন। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বাংলার প্রকৃতি এবং নিঃসঙ্গ মানুষের মনস্তত্ত্ব এক অসামান্য কাব্যরূপ লাভ করে।
বাংলা সংস্কৃতি কেবল লিখিত সাহিত্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, এর শিকড় প্রোথিত বাংলার লোকসমাজে। লোকসংস্কৃতি হলো বাঙালির জীবনযাত্রার অকৃত্রিম অভিব্যক্তি। বাউল গান, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, গম্ভীরা, ছৌ নাচ, এবং যাত্রা পালা-এই সব কিছুই বঙ্গীয় সংস্কৃতির প্রাণ। বাউলদের ‘মনের মানুষ’ খোঁজার দর্শন ও রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার বোধ মিলে বাংলা সংস্কৃতিকে এক অনন্য উদারতা দান করেছে। আবহমান কাল ধরে পালিত বিভিন্ন পার্বণ, যেমন-দুর্গাপূজা, পৌষ মেলা, চড়ক উৎসব, এবং বাংলা নববর্ষ উদযাপন (পহেলা বৈশাখ) বাঙালিকে একটি অখণ্ড সাংস্কৃতিক পরিচয়ে আবদ্ধ করেছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এক গভীর ক্ষত এবং একই সঙ্গে নতুন চেতনার জন্ম দেয়। দেশ ভাগের বেদনা, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন সাহিত্যে এক নতুন মোড় আনে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, এবং পরবর্তী সময়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার প্রমুখ সাহিত্যিকদের লেখায় সমাজ বাস্তবতা ও মানুষের অস্তিত্বের সংকট অত্যন্ত নিপুণ ভাবে ফুটে ওঠে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করে। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ লেখকের সৃষ্টি বাংলা কথাসাহিত্য ও কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে। ভাষা আন্দোলন থেকেই মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে, যা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সকল ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রূপ দান করে।
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের যুগে দাঁড়িয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি এক নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনার সম্মুখীন হয়েছে। প্রযুক্তির বিস্তার ও ইন্টারনেটের কল্যাণে বাংলা সাহিত্য আজ বিশ্বদরবারে আরও সহজলভ্য। সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্রকাশনার যুগে নতুন প্রজন্মের লেখকরা পরীক্ষামূলক লেখালেখিতে মনোনিবেশ করছেন। তবে বিশ্বায়নের স্রোতে নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতি ও ভাষার ঐতিহ্য যাতে হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমান সময়ে বাংলা সাহিত্য শুধুমাত্র আঞ্চলিক গণ্ডির মাঝে আটকে নেই। বিশ্বসাহিত্যের নানান আঙ্গিক ও তত্ত্ব আজ বাংলা ভাষায় অনূদিত হচ্ছে, যা বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করছে। অপরদিকে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে বাঙালি লেখকদের অংশগ্রহণ বাংলা সাহিত্যের বৈশ্বিক গ্রহণ যোগ্যতা প্রমাণ করে। সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য হলো মানব কল্যাণ ও জীবনবোধের জাগরণ। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে মানুষের প্রতি যে গভীর ভালোবাসা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ঘটে ছিল, তা আজও বহমান। প্রাচীন চর্যাপদ থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক ডিজিটাল সাহিত্য-প্রতিটি যুগেই বাংলা সাহিত্য সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। বাংলা সংস্কৃতি তার অসাম্প্রদায়িকতা, উদারতা এবং মানবিক মূল্যবোধের জন্য বিশ্বে অনন্য। প্রবহমান এই সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ করা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের দায়িত্ব। সাহিত্যের আলোয় আলোকিত হোক সমাজ, এবং সংস্কৃতির চর্চায় বিকশিত হোক মানুষের মনন-এই হোক আমাদের বিষয় ভাবনা ও সাধনা। জে/এ
