
মাকসুদুল হক, (হরিনাকুন্ডু) ঝিনাইদহ:
মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর বর্তমানে দেশজুড়ে তীব্র সার সংকট, চরম বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে কৃষি উপকরণ কিনে ধান উৎপাদন করতে গিয়ে ঝিনাইদহের কৃষকেরা চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এই তীব্র সংকটময় পরিস্থিতিতে কৃষকদের অধিকার রক্ষা ও উৎপাদিত ফসলের লাভজনক মূল্য নিশ্চিতকরণের দাবিতে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নে এক বিশাল কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ কৃষক সমিতি’ ঝিনাইদহ জেলা শাখার অন্তর্গত রঘুনাথপুর ইউনিয়ন শাখার উদ্যোগে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক সাধারণ কৃষক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় সংগঠক মোঃ হেলাল উদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ঝিনাইদহ জেলার সাধারণ সম্পাদক আবু তোয়াব অপু। সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে কৃষকদের ৯ দফা দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন ঝিনাইদহ জেলা কৃষক সমিতির অন্যতম সংগঠক তোফাজ্জেল হোসেন লস্কার। সমাবেশটিতে স্থানীয় কৃষক নেতা নজরুল ইসলাম ও শাহাবুদ্দিন সহ রঘুনাথপুর ইউনিয়ন কৃষক সমিতির কর্মীবৃন্দ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও অনুষ্ঠানে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশের প্রধান বক্তা তোফাজ্জেল হোসেন লস্কার তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, “কৃষিপণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট ভেঙে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের সংকট নির্মূল করতে হবে। কৃষকেরা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ফসল ফলিয়ে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অথচ মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ভোক্তাদের চড়া দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। এই লুটপাটতন্ত্র ও সিন্ডিকেট অবিলম্বে ভাঙতে হবে।”
সমাবেশে বক্তারা আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে সারের তীব্র কৃত্রিম সংকটের কারণে বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তার ওপর লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেচ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে ধান উৎপাদনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, যা কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
“কলা ও পান ঝিনাইদহের প্রাণ”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সমাবেশ থেকে বর্তমান সংকট উত্তরণে কৃষকদের পক্ষ থেকে ৯টি জরুরি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো:
কলা ও পানের উন্নত বাজার ব্যবস্থা: ঝিনাইদহের প্রধান অর্থনৈতিক ফসল কলা ও পানের ন্যায্যমূল্য পেতে সরকারি উদ্যোগে উন্নত বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
ধানের লাভজনক মূল্য ও ক্রয় কেন্দ্র: ধানের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে প্রতি ইউনিয়নে সরকারি ধান ক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা।
পাটের সঠিক দাম: গ্রেডিং ও টাস্ক নির্ধারণে আইনানুযায়ী ভুক্তভোগীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পাটের দাম নির্ধারণ করে প্রতি মণ পাটের মূল্য ৬,০০০/- টাকা নিশ্চিত করা।
কৃষিতে বিদ্যুৎ: কৃষি কাজে নিরবচ্ছিন্ন ও ৫০% সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।
চটের বস্তা ব্যবহার: ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিক বস্তা বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব চটের বস্তা চালুর ব্যবস্থা করা।
ওজনে কারচুপি বন্ধ: হাট-বাজারে কৃষিপণ্য বিক্রির সময় অবৈধ ‘তোলা’ ও ‘ধলতা’ নেওয়ার নামে ওজনে ঠকানো ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা।
কৃষি উপকরণের মূল্য: সরকারি মূল্যে প্রকৃত কৃষকদের মাঝে সার, বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ করা।
ভূমি সুরক্ষা আইন: কৃষিজমি রক্ষায় দ্রুত ভূমি সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করা।
প্রকৃত কৃষক কার্ড: প্রকৃত কৃষকদের চিহ্নিত করে সরকারি সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান করা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোঃ হেলাল উদ্দিন বলেন, কৃষকরা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও তারা আজ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। অবিলম্বে সারের কালোবাজারি বন্ধ এবং কৃষকদের এই ৯ দফা দাবি মেনে নেওয়া না হলে জেলার সর্বস্তরের কৃষকদের সাথে নিয়ে আগামীতে আরও বৃহত্তর ও তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।