বুধবার ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩

বিয়ানীবাজার ভূমি অফিসে ‘টাকা দিলেই কাজ, না দিলে হয়রানি’

[print_bangla]

 

স্টাফ রিপোর্টার :

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের সার্ভেয়ার গৌতম কুমার শীলের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি, ভূমিসেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে হয়রানি, অসদাচরণ এবং অনিয়মের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও নামজারি ও অন্যান্য ভূমিসেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। দাবিকৃত অর্থ না দিলে নানা অজুহাতে কাজ আটকে রাখা কিংবা আবেদন নামঞ্জুর করার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ভূমি অফিসে সেবাপ্রার্থীদের একটি অংশ সার্ভেয়ার গৌতম কুমার শীলের কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

নামজারি আবেদন করার পর তপশীল রিপোর্ট হওয়ার পর গৌতম কুমার শীল সেবা গ্রহীতা কে বলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মে হাবিবা মজুমদারকে প্রতি মামলায় ৩,৫০০/- থেকে ৫,০০০/- না দিলে নামজারি করিয়া দিতে পারিবনা। বিগত দিনে কাগজপত্র সঠিক থাকার পরও মোহাম্মদ বাবুল হোসেনের নামজারি আবেদন নম্বর ৪২৮৭৮৬২,ফতেপুরের মোহাম্মদ জাকির হোসেনের ৪২৬০৭১৫, বাঙাল হুদা গ্রামের নিয়াজ উদ্দিনের ৪১৭৮৫৬৬, বাগবাড়ী গ্রামের আব্দুল নূরের ৪১৮২৩১০, পল্লী শাসন গ্রামের মেনুর আলীর ৪২৩৮৩২০, অবৈধ টাকা না দেওয়ার জন্য গৌতম কুমার শীল ইচ্ছাকৃতভাবে নামজারি নামঞ্জুর করিছে। নামজারি নামঞ্জুরের বিষয় যোগাযোগ করলে গৌতম কুমার শীল বলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মে হাবিবা মজুমদারকে টাকা না দেওয়ার কারণে নামঞ্জুর হইয়াছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা

প্রবাসীর কাছ থেকে প্রথমে ৫ হাজার, পরে ৫০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ
আলীনগর ইউনিয়নের এক বয়স্ক আমেরিকান প্রবাসী অভিযোগ করেন, গত ১৩ মে ২০২৬ তারিখে নামজারি সংক্রান্ত কাজে তিনি বিয়ানীবাজার ভূমি অফিসে যান। এ সময় তার কাছে অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ তার। ওই প্রবাসীর দাবি, আলীনগর ইউনিয়ন থেকে ভূমি অফিসে যাওয়ার সময় তার কাছে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি ৫ হাজার টাকা দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে আসেন।

প্রায় ১৫ দিন পর নামজারির অগ্রগতি জানতে সার্ভেয়ার গৌতম কুমার শীলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন তিনি। ভুক্তভোগীর দাবি, তখন তাকে বলা হয় তার দলিলপত্র বেশি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অফিসে না থাকায় কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। একপর্যায়ে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাকে ৫০ হাজার টাকা দিতে বলা হয় এবং টাকা না দিলে নামজারি হবে না বলে জানানো হয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তিনি টাকা দেন এবং এরপর তার নামজারি অনুমোদিত হয় বলে দাবি করেন।

এ কাজে সার্ভেয়ার গৌতম কুমার শীলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এ নামজারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নামজারিসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারি ফি দেওয়ার পরও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়।

তাদের দাবি, সার্ভেয়ার গৌতম কুমার শীলের সঙ্গে কথিত অর্থের সমঝোতা না হলে সাধারণ মানুষের ভূমিসংক্রান্ত কাজ এগোতে চায় না।

তেরাদল মৌজার তাহমিনা আক্তার নামের এক নারীর নামজারি সংক্রান্ত কাজে ১৬ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে ওই নারীর সঙ্গে অশোভন আচরণ এবং আপত্তিকর প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আবেদনকারীদের ফোন করে অফিসে ডাকার অভিযোগ
নামজারি আবেদনের সঙ্গে দেওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন করে আবেদনকারীদের ভূমি অফিসে ডেকে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

তাদের দাবি, অফিসে উপস্থিত হওয়ার পর বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। দাবিকৃত অর্থ দিতে না পারলে নামজারি আবেদন বাতিল বা নামঞ্জুর করার অভিযোগও রয়েছে। আবার নজরুল ইসলাম নামে একজন ভুক্তভোগী বলেন নামজারি আবেদন বাতিল হওয়ার পর গৌতম কুমার শীল ৫,০০০/- হাজার টাকা নিয়ে রিভিউ করিয়ে আবার আবেদন মঞ্জুর করিয়া দেন।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, কোনো কোনো আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর পরবর্তীতে অর্থের বিনিময়ে পুনরায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

‘অফিস আমিই চালাই’—এমন বক্তব্যের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, অফিসে সার্ভেয়ার গৌতম কুমার শীল বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী আচরণ করেন।

দেউনগর এলাকার নুরুজ্জামান আহমদ বাবলুর সঙ্গে কথোপকথনের সময় তিনি নিজেকে একই সঙ্গে এসি ল্যান্ড, কানুনগো ও সার্ভেয়ার হিসেবে উল্লেখ করে অফিসের কার্যক্রমে নিজের প্রভাবের কথা বলেছেন—এমন অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কার্যক্রমে তিনি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং অন্যদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত হতে দেন না।

নারীর সঙ্গে অসদাচরণ ও মারধরের অভিযোগ

কিছুদিন আগে জলঢুপ এলাকার এক নারীর ভূমিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থ নেওয়ার পরও কাজ না করার অভিযোগ ওঠে গৌতম কুমার শীলের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে ওই নারীর সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগও করা হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই নারীর অভিভাবকের সঙ্গে সার্ভেয়ারের বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সড়কে তাকে মারধরের ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ ঘটনার বিস্তারিত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য কিংবা কোনো আইনগত পদক্ষেপের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তদন্তের দাবি ভুক্তভোগীদের

একের পর এক অভিযোগ ওঠায় বিয়ানীবাজার উপজেলা ভূমি অফিসের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সেবাপ্রার্থীরা। তাদের অভিযোগ, ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, সার্ভেয়ার গৌতম কুমার শীলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযুক্তের বক্তব্য
সার্ভেয়ার গৌতম কুমার শীলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সাথে কেঁপে উঠে অশালীন আচরণ করেন এবং সাংবাদিকদের কে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, নামজারি নথি এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্য যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। পর্ব (২)

সূত্র : দৈনিক আজকের বসুন্ধরা

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিয়ানীবাজার ভূমি অফিসে ‘টাকা দিলেই কাজ, না দিলে হয়রানি’

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top