
জন্মেছিলেন জমিদার বংশে। শুরুতে কবিতা, নিজেই লিফলেট ছাপিয়ে পাড়ায় বিলি করতেন। তারপর লিখলেন নাটক। নাটকের কোম্পানী পড়ে দেখতেও রাজী হলো না পাণ্ডুলিপি, পুড়িয়ে দিলেন। রাজনীতিতে তুমুল জড়ালেন… কিন্তু জমিদার ঘরের সন্তান বলে অযথাই কথা শুনতে হলো প্রবল। রাজনীতিই একসময় নিয়ে গেলো জেলখানায়। সেখানে বসেই উপন্যাসের মাথায় এলো উপন্যাসের প্লট… লেখা হলো ’চৈতালি ঘূর্ণি’। কিন্তু ছাপবে কে?
পকেটে পয়সা নেই, তবু নিজের খরচেই ছেপে দিলেন। কিন্তু পড়ার বা কেনারও যে কেউ নেই! বাইন্ডার এসে ঝাড়ি দিয়ে যায় বাঁধাইয়ের টাকা না পেলে বই সব কেজির দরে বেচে দিবে। মেয়ের চিকিৎসায় ডাক্তার ডাকার সামর্থ নেই, থাকেন বন্ধু যামিনী রায়ের বাড়িতে। চৌষট্টি বছর বয়সেও পেট চালাতে চাকরি করেন, অফিসে যাতায়াত হেঁটে, গাড়িভাড়ার অভাব।
এর মধ্যে বোম্বে টকিজ থেকে হিমাংশু রায় ডেকে পাঠালেন, বাঙালি গল্পকার প্রয়োজন। মাইনে মাসে সাড়ে তিনশ টাকা! একে তো বোম্বে টকিজ, দ্বিতীয়ে হিমাংশু রায় আর মূলত এরকম ভয়ঙ্কর আর্থিক টানাটানির মধ্যে এই চাকরিতে পাগলেও ‘না’ বলবে না। বন্ধু শনিবারের চিঠির সজনীকান্তও সায় দিলেন যেতে। কিন্তু তারাশঙ্কর গেলেন না। মা’কে সেকথা জানাতে মা উত্তর লিখলেন ‘তুমি এমন প্রলোভন জয় করিয়াছ জানিয়া আমি পরম তৃপ্তি পাইয়াছি। সুখী হইয়াছি।”
কেউ ভাবতে পারবে এরকম? গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে করে ‘এমন একটা মা দে না…’
বোম্বে টকিজে না গিয়ে, শুধু লিখেই সবটুকু অবস্থা পাল্টে ফেললেন। লেখার টাকায় গাড়িও কিনলেন! এই কীর্তি বোধহয় ঐ সময়ে আর কেউ করতে পারেননি। কাজী নজরুল ক্রাইসলার কিনেছিলেন, কিন্তু তা সাহিত্য করে নয়, সংগীত করে।
আরেক জগদ্বিখ্যাত লেখক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় খুশিতে আটখানা হয়ে সবাইকে বলে বেড়াতে লাগলেন ‘জানো, তারাশঙ্কর গাড়ি কিনেছে’। শুনে লোকে হাসে, বলে ‘তারাশঙ্কর গাড়ি কিনেছে তো আপনার কী?’ বিভূতি অবাক হয়ে বলেন ‘একটা মানুষ শুধু লিখে একটা আস্ত মটরগাড়ি কিনে ফেলেছে, এতে আনন্দ পাব না!’
জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠলেন। পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ পেলেন। বোম্বে টকিজে যোগ দিলে হয়তো স্ক্রিণপ্লে রাইটার হতেন। কিন্তু না যাওয়ায় যেসব সাহিত্য করলেন, তা থেকে তৈরি হলো অমর সব চলচ্চিত্র। সত্যজিৎ রায়ই করলেন দুটো! তবে অজয় কর পরিচালিত সপ্তপদী এই সবগুলোর মধ্যেই আলাদা হয়ে থাকবে হয়তো। আর উচ্চাসনে থাকবে সত্যজিৎ রায়ের জলসাঘর।
৭৩ বছরের জীবনে লিখেছেন সব মিলিয়ে প্রায় শখানেক বই। তুমুল জনপ্রিয় সব উপন্যাস আর গল্প। নোবেল সাহিত্যের খাতায় নাম উঠলো মনোনয়নের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। হয়তো হয়েও যেতো, কিন্তু ঐ সময়েই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়। মরণোত্তর নোবেল হয় না, সেবার পেলেন পাবলো নেরুদা!
জীবন এতো ছোট কেনে?
আজ তাঁর সেই চলে যাওয়ার দিন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরো কাজ করার পরিকল্পনা করছিলেন। হলো না, তার আগেই চলে গেলেন!
#সৈয়দ নজরুল এর ওয়াল থেকে