
বিধান চন্দ্র সান্যাল-
শেষ বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির লাল ইটের দেওয়ালে। শাল-মহুয়ার পাতার ফাঁক দিয়ে আসা রোদ কোথাও সোনালি, কোথাও তামাটে। মনে হচ্ছিল, সময় নিজেই যেন তার পুরোনো খাতা খুলে বসেছে-প্রতিটি ইট, প্রতিটি খিলান, প্রতিটি নিঃশব্দ বারান্দায় লেখা রয়েছে বিস্মৃত দিনের কোনো না কোনো গল্প।
অর্কদীপ সিংহ সেই গল্প পড়তেই এসেছিল। পেশায় সে ইতিহাসের গবেষক। ঝাড়গ্রামের মল্লদেব রাজবংশের দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখছিল। বইয়ের পাতায় পাওয়া তথ্যের বাইরে, সে খুঁজছিল ইতিহাসের সেই অদৃশ্য স্পন্দন-যা কোনো সাল-তারিখে ধরা পড়ে না, অথচ পুরোনো স্থাপত্যের গায়ে হাত রাখলে অনুভব করা যায়।
ক্যামেরার লেন্স ঠিক করতে করতে সে যখন রাজবাড়ির একটি বিশাল ঝাড়লণ্ঠনের দিকে তাকিয়ে ছিল, তখন পিছন থেকে ভেসে এল চাপা হাসির শব্দ।
“এত গভীর ভাবে তাকালে কিন্তু লণ্ঠনটা লজ্জা পেয়ে নিভে যেতে পারে!”
অর্কদীপ ঘুরে দাঁড়াল।
সামনে এক তরুণী। হালকা হলুদ শাড়ি, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা, মুখে এমন এক হাসি-যেন এই প্রাসাদের বহু পুরোনো রহস্যের অন্তত কয়েকটি তার জানা আছে।
“আমি মৃণালিনী,” সে বলল। “এই রাজবাড়ির সঙ্গে আমাদের পরিবারের পুরোনো সম্পর্ক। আপনি নিশ্চয়ই ইতিহাস খুঁজছেন?”
অর্কদীপ হেসে বলল,-“ইতিহাসই খুঁজছি। তবে বইয়ের ইতিহাস নয়।”
“তাহলে ভুল জায়গায় এসেছেন।”
“কেন?”
মৃণালিনী একটু এগিয়ে এসে বলল, -“কারণ এই রাজবাড়ির আসল ইতিহাস বইয়ে নেই।” কথাটা বলেই সে হাঁটতে শুরু করল।
অর্কদীপও ক্যামেরাটা কাঁধে তুলে তার পিছু নিল। রাজবাড়ির অলিন্দ পেরোতে পেরোতে মৃণালিনী বলতে লাগল বহু পুরোনো দিনের কথা। মুঘল আমলের ইতিহাস, রাজবংশের উত্থান, জঙ্গলঘেরা ভূখণ্ডের নাম থেকে কীভাবে ঝাড়গ্রামের পরিচয় তৈরি হয়েছিল-তার কথায় ইতিহাস যেন শুকনো তথ্য হয়ে থাকল না; জীবন্ত হয়ে উঠল।
অর্কদীপ বিস্মিত হয়ে শুনছিল।
মৃণালিনী হঠাৎ থেমে বলল, -“কী হলো? এত চুপ কেন?”
—“ভাবছি।”
—“কী?”
—“আপনি ইতিহাস পড়েছেন, নাকি ইতিহাস আপনাকে পড়িয়েছে?”
মৃণালিনী হেসে উঠল। সেই হাসি পুরোনো প্রাসাদের নিস্তব্ধতায় অদ্ভুতভাবে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর তারা গেল রাজবাড়ির এমন কিছু অংশে, যেখানে সাধারণ পর্যটকের পা সচরাচর পড়ে না। কোথাও পুরোনো দেওয়ালে সময়ের ক্ষত, কোথাও বন্ধ দরজার গায়ে জমে থাকা ধুলো, কোথাও অন্ধকার করিডর-যেন কয়েকশো বছর ধরে কোনো অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।
একটি অন্ধকার সুড়ঙ্গের সামনে এসে মৃণালিনী নিচু গলায় বলল, -“শুনেছেন, এই পথ দিয়ে একসময় বিপদের সময় রাজপরিবারের লোকেরা বেরিয়ে যেতেন?”
অর্কদীপ টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে তাকাল।
-“সত্যি?”
-“কে জানে!”
মৃণালিনীর চোখে আবার সেই দুষ্টু হাসি।
-“তবে সাবধান। পুরোনো সুড়ঙ্গে পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গে পুরোনো সাপও থাকতে পারে।”
অর্কদীপ একটু পিছিয়ে এল।
মৃণালিনী হেসে ফেলল।
-“ইতিহাস নিয়ে এত সাহস, আর একটা সাপের গল্পেই ভয়?”
অর্কদীপও হেসে বলল, -“ইতিহাসের সাপ কাগজে থাকে। আসল সাপের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই।”
হাসতে হাসতেই তারা বেরিয়ে এল। সন্ধ্যা তখন নামছে।
রাজবাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে অর্কদীপ দেখল, দূরের শালবনের মাথার ওপর আকাশে একে একে তারা জ্বলছে। কোথাও কোনো অচেনা গ্রাম থেকে ভেসে আসছে মাদলের মৃদু শব্দ। বাতাসে মিশে আছে শুকনো পাতার গন্ধ।
মৃণালিনী দুটো কফির কাপ নিয়ে এসে পাশে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
নীরবতারও যে নিজস্ব ভাষা আছে, সেদিন অর্কদীপ প্রথমবার যেন তা বুঝতে পারল।
কফিতে চুমুক দিয়ে সে বলল, -“আজ একটা জিনিস বুঝলাম।”
-“কী?”
-“ইতিহাস শুধু পুরোনো দিনের কথা নয়।”
মৃণালিনী তার দিকে তাকাল।
অর্কদীপ ধীরে বলল, -“কখনও কখনও ইতিহাসের ভেতর দিয়ে বর্তমানও নিজের একটা গল্প লিখে যায়।”
মৃণালিনী কিছু বলল না। শুধু দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মৃদুস্বরে বলল, -“এই রাজবাড়ির দেওয়াল অনেক কিছু দেখেছে। রাজা-রাজড়া, যুদ্ধ, অভিমান, অপেক্ষা… কত মানুষ এসেছে, আবার চলে গেছে। কিন্তু কিছু মুহূর্ত থেকে যায়।”
-“কীভাবে?”
-“হয়তো মানুষের মনে।”
অর্কদীপ তাকিয়ে রইল তার দিকে।
সন্ধ্যার আলো তখন নিভে গেছে। রাজবাড়ির পুরোনো ঝাড়লণ্ঠনগুলো একে একে জ্বলে উঠেছে। আলো এসে পড়েছে মৃণালিনীর মুখে।
সেদিন অর্কদীপ কোনো ছবি তুলল না।
ক্যামেরাটি তার পাশে নিশ্চুপ পড়ে রইল।
কারণ সে বুঝেছিল-কিছু দৃশ্য ক্যামেরায় ধরে রাখা যায় না। কিছু মুহূর্ত কেবল অনুভব করতে হয়।
পরদিন সকালে সে রাজবাড়ি ছেড়ে চলে গেল।
গবেষণার খাতায় অনেক তথ্য লেখা হলো। বহু পুরোনো দলিলের উল্লেখ হলো। রাজবংশের ইতিহাসও যথাসম্ভব যত্নে উঠে এল তার লেখায়।
শুধু শেষ পাতায় একটি বাক্য লিখে সে থেমে গেল-
“কিছু প্রাসাদ ইট-পাথরে তৈরি হয়, আর কিছু প্রাসাদ মানুষের স্মৃতিতে।”
তারপর কলম থামিয়ে অর্কদীপ জানলার বাইরে তাকাল।
দূরে কোথাও শালবনের মাথায় তখন সকালের রোদ।
আর তার মনে হচ্ছিল, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির সেই সন্ধ্যা এখনও শেষ হয়নি। জে/এ