
মাকসুদুল হক, ঝিনাইদহ–
জেলার কিছু নিভৃত পল্লীর মেঠোপথ ধরে হাটতেই এক অভূত পুর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রকৃতি যখন আপন খেয়ালে সাজতে বসে, তখন তার অলঙ্কারের কোনো কমতি থাকে না। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে চারপাশ যখন রোদেলা দহন আর ক্লান্তি বেলায়, ঠিক তখনই কোনো এক মায়াবী বাঁকে দেখা মেলে এক অদ্ভুত রূপসীর। ঘন সবুজ পাতার ঘোমটা টেনে সে যেন লাজুক বধূর মতো দাঁড়িয়ে থাকে পথের ধারে। আর সেই সবুজ ঘোমটার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় সোনালী রঙের থোকা থোকা ঝুমকো-যাকে আমরা চিনি ‘সোনালু’ নামে।
কবিরা সোনালুকে বলেন ‘প্রকৃতির কানে দুল’ কিংবা ‘নাসিকা অলঙ্কার’। সত্যিই তো, নিবিড় ঘন সবুজ পাতার মাঝে যখন দীর্ঘ মঞ্জুরিতে হলুদ ফুলগুলো থোকায় থোকায় নিচের দিকে ঝুলে থাকে, তখন মনে হয় যেন কোনো অভিমানী কিশোরী তার নাকে সোনার ঝাজর ঝুলানো নাক ফুল পরে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসের হালকা দোলায় সেই ঝাজর যখন নড়ে ওঠে, তখন মনে হয় প্রকৃতির হৃদপিণ্ড বুঝি দুলছে। কৃষ্ণচূড়ার আগুনরাঙা লাল আর শিমুলের তীব্রতাকে ছাপিয়ে সোনালু এক স্নিগ্ধ প্রেমের নাম। প্রেমিক যখন তার প্রিয়তমার খোঁপা সাজাতে চায়, তখন সোনালুর এই ঝালর যেন শ্রেষ্ঠ উপহার। রূপ-রস-গন্ধে ভরা এই ফুলগুলো যখন মৃদু বাতাসে ঝরে পড়ে পথের ওপর, তখন মনে হয়, পৃথিবীটা বুঝি এক হলদেটে গালিচায় মোড়ানো রোমান্টিক মঞ্চ। সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, প্রেম তো আর কিছু নয়-এই হলুদ ঝাজরের মতো হৃদয়ে দোলা দিয়ে যাওয়া এক শান্ত অনুভূতি।
প্রকৃতির এই আল্পনা বড়ই অদ্ভুত। কৃষ্ণচূড়া যেখানে সাহসের কথা বলে, শিমুল যেখানে আবেগের রং ছড়ায়, সোনালু সেখানে কথা বলে আভিজাত্য আর স্নিগ্ধতা নিয়ে। তার প্রতিটি পাপড়ি যেন সোনার পাতের নিখুঁত কারুকাজ। গ্রীষ্মের নিঝুম দুপুরে যখন কোকিল ডাকে আর সোনালুর হলুদ বরণ ঝাজর বাতাসে ছন্দ তোলে, তখন চারপাশের কঠোর বাস্তবতাও মায়াবী হয়ে ওঠে। ‘সবুজ ঘোমটার ফাঁকে নাক ফুলে ঝাজর ঝুলানো’ এই সোনালু কেবল একটি ফুল নয়, এটি প্রকৃতির এক নিঃশব্দ প্রেমপত্র। যার রূপ আছে চোখের প্রশান্তির জন্য, রস আছে হৃদয়ের গভীরতার জন্য, আর গন্ধ আছে স্মৃতির গহীনে হারিয়ে যাওয়ার জন্য। এই সোনালু ঝরা পথে হাত ধরে হাঁটা মানেই প্রকৃতির সবচেয়ে বিশুদ্ধ রোমান্টিক কাব্যের অংশ হয়ে যাওয়া। জে/এ
