বৃহস্পতিবার ১৮ই জুন, ২০২৬ ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩

অন্তরাল-নিবাসী মহান সাধক-দরবেশ সিরাজ সাঁই

[print_bangla]

মাকসুদুল হক, হরিনাকুন্ডু (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি-

“বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের গানের ছত্রে ছত্রে যাঁর নাম পরম শ্রদ্ধায় ও আত্মনিবেদনে উচ্চারিত হয়েছে, যিনি লালনের আধ্যাত্মিক চেতনার গুরু এবং নেপথ্য কারিগর তিনি দরবেশ সিরাজ সাঁই। অথচ ইতিহাসের এক অদ্ভুত নিয়তিতে এই মহান সাধক চিরকাল রয়ে গেছেন লোক চক্ষুর অন্তরালে। লালনের আলোয় বিশ্ব আলোকিত হলেও, আলোর পেছনের সেই মূল বাতিঘরটি রয়ে গেছে এক গভীর ছায়ায়। তবে সিরাজ সাঁই কেবল লালনের গানের কোনো রূপক চরিত্র ছিলেন না, সমকালীন ও আধুনিক গবেষকদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তাঁর এক রক্তমাংসের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লালন-ভৌগোলিক গবেষক খোন্দকার ড. রিয়াজুল ইসলাম তাঁর মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখিয়েছেন, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হরিশপুর গ্রামেই ছিল এই নিভৃতচারী সাধকের আদি নিবাস এবং মূল মাজার। কুষ্টিয়ার লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং অন্যতম প্রধান লালন গবেষক ড. আনোয়ারুল করীম তাঁর দীর্ঘ গবেষণায় নিশ্চিত করেছেন যে, সিরাজ সাঁই ছিলেন জাত-পাতহীন এক অনন্য দর্শনের অধিকারী মুসলমান ফকির, যিনি পেশায় ছিলেন পালকি বাহক। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ “মহাত্মা লালন ফকীর”-এ গবেষক বসন্তকুমার পাল তৎকালীন প্রবীণ লালনশিষ্যদের সাক্ষাৎকার ও লোকশ্রুতির ভিত্তিতে সিরাজ সাঁইকে লালনের উদ্ধারকর্তা ও দীক্ষাগুরু হিসেবে অকাট্যভাবে প্রমাণ করেন।
অন্য দিকে, বাউল দর্শনের শ্রেষ্ঠ গবেষক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর “বাংলার বাউল ও বাউল গান” গ্রন্থে লালন-মানস গঠনে সিরাজ সাঁইয়ের মরমি দর্শনের গভীর প্রভাবের কথা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এমনকি লালনের সমসাময়িক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, লালনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বিখ্যাত সাংবাদিক ও সাধক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার এবং ১৮৯০ সালে লালনের মৃত্যুর মাত্র পনেরো দিন পর প্রকাশিত মীর মশাররফ হোসেনের দায়িত্বে থাকা ঐতিহাসিক ‘হিতকরী’ পত্রিকা-উভয় সূত্রেই প্রথম স্পষ্ট ভাবে লিখিত রূপ দেওয়া হয় যে, লালন সাঁই মূলত সিরাজ সাঁই নামের এক পরম দরবেশের কাছেই বাউল ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। হরিশপুরের ধুলোবালি থেকে ছেঁউড়িয়ার আখড়া-ইতিহাসবিদদের এই প্রামাণ্য দলিলের আলোকেই আজ আমরা খুঁজবো লালন-মানসের সেই নেপথ্য বাতিঘরকে।”
প্রচারবিমুখ বাউল ও সুফি সাধকদের নিখুঁত জন্ম-মৃত্যুর হিসাব ইতিহাসের সাধারণ পাতায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হলেও, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর হরিশপুর গ্রামে সিরাজ সাঁইজির মূল মাজারের ফলক পাঠককে এক অকাট্য সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সেখানে স্পষ্টাক্ষরে খোদাই করা আছে এই মহান নেপথ্য সাধকের জীবনকাল। বাংলা ১১২৫ বঙ্গাব্দের এক মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি এই ধরাধামে আত্মপ্রকাশ করেন, যা ইংরেজি ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দের সমসাময়িক। এরপর দীর্ঘ আট দশক জুড়ে অন্তরে অনন্ত সত্যের বাসনা নিয়ে, কাঁধে জাগতিক পালকির ভার বইতে বইতে অবশেষে বাংলা ১২০৫ বঙ্গাব্দে (১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে) তিনি তিরোধান লাভ করেন।
ইতিহাসের এই কালপঞ্জি একটি দারুণ সমীকরণ উন্মোচন করে। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের জন্ম ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে। সেই হিসেবে, ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে যখন গুরু সিরাজ সাঁই পরলোকগমন করছেন, শিষ্য লালন তখন ২৪ বছরের এক তেজোদীপ্ত যুবক। যৌবনের সেই প্রারম্ভেই মুমূর্ষু লালনকে নদী থেকে তুলে এনে জীবনদান এবং পরবর্তীতে নিজের খণ্ডকালীন সান্নিধ্যে জাত-পাতহীন যে বিশ্বদর্শনের বীজ সিরাজ সাঁই বুনে দিয়েছিলেন, তা-ই পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে ছেঁউড়িয়ার আকাশে লালন নামের এক মহীরুহ তৈরি করেছিল। গুরুর এই ৮০ বছরের পরিব্যপ্ত জীবনকালই ছিল লালন-মানস গঠনের মূল আঁতুড়ঘর।
কাঁধের পালকিতে, অন্তরের অনন্ত বাসনা, আজকের বৈষয়িক দুনিয়ায় আমরা যখন মানুষের পরিচয় খুঁজি তাঁর পদবি বা অর্থবিত্তে; ঠিক তখন ইতিহাসের পাতা উল্টালে সিরাজ সাঁইয়ের জীবন আমাদের এক পরম বিস্ময়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই মহান আধ্যাত্মিক সাধকের জাগতিক পেশা কোনো জাঁকজমকপূর্ণ কিছু ছিল না—তিনি ছিলেন একজন অতি সাধারণ পালকি বাহক বা ‘বেহারা’। দিনভর অন্যের বোঝার ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে চলাই ছিল তাঁর নিয়তি। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, ধুলোবালি মাখা শরীরে যিনি চার বেহারার পালকি টেনে নিয়ে যেতেন, তাঁরই অন্তরে যে খেলা করতো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক গভীরতম দর্শন, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা ছিল অসম্ভব।
সিরাজ সাঁইয়ের এই পালকি টানার পেশা কেবলই জীবিকার তাগিদ ছিল না, এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক অনন্য দেহতত্ত্বের গভীর দর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনা । তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের এই নশ্বর দেহই হলো পরমাত্মার আসল পালকি বা খাঁচা, আর জীবাত্মা হলো সেই পালকির সওয়ারি। বাহ্যিক জীবনে তিনি হয়তো লোকচক্ষুর সামনে কাঁধের পালকিতে বহন করেছেন কোনো সাধারণ কুলবধূকে; কিন্তু এক অদ্ভুত পরম সত্য হলো-গুরু সিরাজ সাঁইয়ের সেই চওড়া কাঁধের ওপর ভর দিয়েই শিষ্য লালন শাহ আত্মিক জগতের ডানায় ভর করে পাড়ি দিয়েছেন পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। এই নিরহংকার শ্রমজীবী মানুষটি প্রমাণ করে গেছেন যে, সত্যের সন্ধান পাওয়ার জন্য কোনো আভিজাত্যের প্রয়োজন হয় না; বরং মাটির কাছাকাছি থাকা অনাড়ম্বর জীবনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে পরম সত্তার প্রকৃত বাতিঘর। গুরুর কাঁধের সেই পালকি আর অন্তরের অনন্ত বাসনাই পরবর্তীতে মহীরুহ হয়ে দানা বেঁধেছিল শিষ্য লালনের হৃদয়ে। লালন যে তাঁর গুরুর এই গভীর আধ্যাত্মিক দর্শনের কাছে আজীবন ঋণী ছিলেন, তার হাজারো চাক্ষুষ প্রমাণ মেলে লালনের নিজের রচিত অসংখ্য গানের শেষাংশে বা ভণিতায়। যেখানে লালন নিজেকে গুরুর চরণে সঁপে দিয়ে গেয়ে ওঠেন “যা করো তাই করো রে মন পিছের কথা রেখ স্মরণ বরাবরই।
দরবেশ সিরাজ সাঁই কয় শোন রে লালন হোস নে কারো ইন্তেজারি।।” কিংবা নিজের ভেতরের মোহগ্রস্ততা দূর করতে গিয়ে অকপটে গুরুর মুখের বাণীকে স্মরণ করে বলেন-“সিরাজ সাঁই কয় লালন, কিসি তোর এত পদবি…।” এই গানগুলোর একেকটি ছত্রই প্রমাণ করে, বাহ্যিক রুপ-ভেদে সিরাজ সাঁই এক সাধারণ বেহারা হলেও, লালন-মানসের আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের তিনি ছিলেন একচ্ছত্র অধিপতি ও নেপথ্য বাতিঘর। ইতিহাস আর লোকশ্রুতির এক রোমাঞ্চকর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে সিরাজ সাঁই ও লালনের প্রথম সাক্ষাৎ। তরুণ বয়সে তীর্থভ্রমণে বের হয়ে মারাত্মক গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হন লালন। সে সময়কার সামাজিক কুসংস্কারের কারণে রোগাক্রান্ত ও প্রায় মৃতপ্রায় লালনকে ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয় কালিগঙ্গা নদীতে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া সেই অচৈতন্য দেহটি ভাসতে ভাসতে এসে ঠেকে তৎকালীন নদী তীরবর্তী হরিশপুর গ্রামের ঘাটে। আর ঠিক তখনই ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন দরবেশ সিরাজ সাঁই। অকৃত্রিম স্নেহ, অহিংস জীবনবোধ এবং গভীর দেহতত্ত্বের বাণী লালনকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে যার পরিণতিতে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে লালন দীক্ষা নেন সিরাজ সাঁইয়ের চরণে। জাতহীন মানবধর্মের প্রবক্তা সিরাজ সাঁইয়ের ভাবাদর্শের মূল কথাটি ছিল-মানুষে মানুষে কোনো ভেদ নেই। সেই যুগে দাঁড়িয়ে তিনি প্রচার করেছিলেন যে, মানুষের বাহ্যিক জাত বা পরিচয় বড় নয়, তার ভেতরের মনুষ্যত্বই আসল। গুরুর এই সর্বজনীন মানবধর্মের শিক্ষাই লালনের মনের সমস্ত সংকীর্ণতা দূর করে দিয়েছিল। সিরাজ সাঁই লালনকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে নিজের অহংকে চূর্ণ করে পরম সত্যের সন্ধান করতে হয়। গুরুর কাছ থেকে পাওয়া এই জাতহীন শিক্ষার কারণেই পরবর্তীতে লালন গেয়ে উঠতে পেরেছিলেন, “সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে…”। লালনের মানবতাবাদী দর্শনের যে বিশাল ইমারত আজ আমরা দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর মূলত স্থাপন করেছিলেন এই প্রচারবিমুখ গুরুই। ছেঁউড়িয়া বনাম হরিশপুর ফিচারের শেষ প্রান্তে এসে আমাদের চোখ ফেরাতে হয় সিরাজ সাঁইয়ের সমাধি বা মাজারের দিকে। লালন গবেষক ও ভক্তদের মাঝে এই সমাধি নিয়ে একটি মিষ্টি ঐতিহাসিক কৌতূহল রয়েছে। ঐতিহাসিক প্রমাণ অনুযায়ী, ঝিনাইদহের হরিশপুরেই সিরাজ সাঁইয়ের মূল সমাধি ও সাধনপীঠ অবস্থিত, যেখানে আজও তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে বাউল ও ভক্তরা সমবেত হন। তবে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াতে মূল লালন মাজারের ভবনের ঠিক বাইরের বারান্দায় আরেকটি সমাধি রয়েছে, যা ভক্তমহলে সিরাজ সাঁইয়ের সমাধি হিসেবেই পরিচিত। জনশ্রুতি আছে, পাকিস্তান আমলে মাজারের মূল ভবন তৈরির সময় সিরাজ সাঁইয়ের সমাধিটি মূল দেয়ালের বাইরে পড়ে যায়। লালনভক্তরা এই ঘটনাটিকে মিলিয়ে নেন লালনেরই সেই বিখ্যাত গানের মরমি চরণের সাথে-“সে আর লালন এক ঘরে রয়, তবু লক্ষ যোজন ফাঁকরে…”। স্থান নিয়ে বিতর্ক বা রহস্য যাই থাক না কেন, সিরাজ সাঁই আজও বেঁচে আছেন লালন অনুসারীদের হৃদয়ে এবং বাংলা লোকসংস্কৃতির অন্তহীন প্রেরণায়। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্তরাল-নিবাসী মহান সাধক-দরবেশ সিরাজ সাঁই

১৮ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top