
বিধান চন্দ্র সান্যাল
“মুখঢাকা রুদ্ধমান আলোয়,
শ্রাবণ-সমাচ্ছন্ন
প্রভাতের কপালে
উঠল না-
গহন মোহে,-
কুজনহীন, দুয়ার দেওয়া,-
পুন তার চরণ ফেলে
রবে পথ চলে।
-কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
১৯৪১ সালের ৬ আগস্ট (১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ) জোড়া সাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২২ শ্রাবণ কেবল একটি প্রয়াণ তিথি নয়; এটি বাঙালি জাতির মননে এক অনন্ত শূন্যতা ও নবচেতনার সংযোগস্থল। প্রিয় ঋতু বর্ষার সজল ধারায় মহাকালের যাত্রায় লীন হয়ে যাওয়ার এই দিনটি শোক ছাপিয়ে আজ বিশ্ববাসীর কাছে এক সৃষ্টিশীল উপলব্ধির নাম। শ্রাবণ যেন ছিল কবির জীবনে তিল তিল করে আঁকা অনুভব আর অনুভূতির জলছবি। “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আমি বাইবো না মোর খেয়া তরী এই ঘাটে-গো।” জোড়া সাঁকো ঠাকুর পরিবারের শ্যামল অঙ্গনের মায়া কাটিয়ে বেলা ১২ বেজে ১০ মিনিটে অস্তমিত হলেন দিবাকর। তিনি চলে গেলেন, অমৃতলোকে। প্রকৃতিকে কাঁদিয়ে, তার অমর প্রস্থান-
“মৃত্যু অজ্ঞতা মোর
আমি তার তরে
ক্ষণে ক্ষণে শিহরিয়া কাঁপিতেছে ডরে
এত ভালবাসি বলে হয়েছে প্রত্যয়
মৃত্যুরে আমি ভালোবাসিবো নিশ্চয়।”
এই অসীম, অনন্ত মহামানব, যিনি তাঁর দীর্ঘ ৮০ বছরের জীবন সাধনায়-জীবন আর মৃত্যুর এক ঈশ্বরিক মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, তিনি হলেন: বিশ্বে শ্রেষ্ঠ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ।
শ্রাবণের মেঘ ও বৃষ্টির সঙ্গে কবির ছিল প্রাণের সম্পর্ক। বর্ষার গান ও কবিতায় তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের গভীরতম সুর। প্রকৃতির আপন ছੰদে, শ্রাবণের ধারায় চিরবিদায় নেন কবি। বর্ষা এলেই বাঙালির মনে বেজে ওঠে রবীন্দ্র সংগীতের মূর্ছনা। যে শ্রাবণ ধারাকে কবি ভালোবেসে ছিলেন পরম আবেশে, সেই মাসটিই তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় রচনা করল। মৃত্যু তাঁর কাছে ভীতিকর কিছু ছিল না, বরং জীবনের এক সুনির্দিষ্ট পূর্ণতা হিসেবেই তিনি মৃত্যুকে দেখেছেন।
কান্নার দিন পেরিয়ে দিনটি আজ আত্মোপলব্ধির। রচনায় ও গানে কবি আজও সমান ভাবে বর্তমান। তাঁর দর্শন মানব জাতিকে পথ দেখায়। বাইশ শ্রাবণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শারীরিক মৃত্যু মানেই সবকিছুর সমাপ্তি নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে অমরত্ব লাভ করেছেন। এই দিনটিতে শোক পালনের চেয়ে তাঁর আদর্শ ও দর্শনকে চেনার অবকাশ বেশি প্রয়োজন।সুখে-দুঃখে বাঙালি রবীন্দ্রনাথে আশ্রয় খোঁজে। বিশ্ব মঞ্চে বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক।সংকটে ও পরিবর্তনে তাঁর সৃষ্টি জোগায় সাহস।
বাঙালির জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে রবীন্দ্রনাথ জড়িয়ে আছেন। আমাদের উৎসব, প্রতিবাদ, প্রেম ও মননশীলতায় তিনি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২২ শে শ্রাবণ তাই কেবল হারানোর বেদনা নয়, তাঁকে নতুন করে পাওয়ার দিন। গুরুদেবের বিদায় বেলায়, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, নিজের শ্রদ্ধা নিবেদন করে লিখেছেন-
“দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপারে কোলে বাংলার কবি শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি তুলে চলে যাবে বলেন শ্রাবণের মেঘ ছুটে এলো দলে দলে” হ্যাঁ, তিনিই হলেন সেই অসীম, অনন্ত, প্রাণ-প্রিয় রবি ঠাকুর। যার জীবনাবসানের এই দিন, বাইশে শ্রাবণ, আজও বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেয় সেই সময়ের কথা। বাইশ শ্রাবণের মেঘে ঢাকা আকাশ আমাদের চোখে জল আনে ঠিকই, কিন্তু সেই জল ধুয়ে দেয় সংকীর্ণতার কালিমা। রবীন্দ্রনাথ আমাদের যে চেতনার আলো দিয়ে গেছেন, তা কখনো ম্লান হয় না। এই শ্রাবণ সন্ধ্যায় কবিপ্রণাম জানাই সেই মহাপ্রাণকে, যাঁর সৃষ্টি চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে কাল থেকে কালান্তরে। ২২ শ্রাবণ দিনটি শুধু শোকের নয়, বরং রবীন্দ্রচেতনা ও তাঁর সৃষ্টিকে নতুন করে হৃদয়ে ধারণ করার এক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। মৃত্যুকে এক নতুন জানালা হিসেবে দেখার যে দর্শন কবি রেখে গেছেন, তা উপলব্ধি করার দিন। জে/এ
