
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ৮ নম্বর রহিমানপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী নরাই বিল (বিল নললই) মৌজার সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত খাস পুকুরে দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছেন ২৯টি ভূমিহীন কৃষক পরিবার। বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুরে তারা নিজেদের নামে বরাদ্দ পাওয়া ছয়টি পুকুরে প্রায় ১২ মণ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করেন। এ সময় কৃষক-কৃষাণীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নরাই বিল মৌজায় প্রায় সাড়ে ৩৩ একর আয়তনের ছয়টি খাস পুকুর তৎকালীন এরশাদ সরকারের আমলে ২৯টি ভূমিহীন কৃষক পরিবারকে ৯৯ বছরের জন্য খাস দলিলের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বরাদ্দ পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে ওই পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিজেদের ইচ্ছামতো অন্যদের কাছে পুকুর বর্গা দিয়ে আর্থিক সুবিধা ভোগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অধিকাংশ প্রকৃত উপকারভোগী বঞ্চিত হন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২৯টি পরিবার নিজেদের বরাদ্দকৃত পুকুরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। কিন্তু পরে শাহ আলম, আব্দুল লতিফ ও ইন্তাজুল নামে তিনজনের যোগসাজশে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে দুই বছরের জন্য পুকুরগুলো লিজ দেওয়া হয়। এ সময় রাতের আঁধারে পুকুরপাড়ের প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ গাছ কেটে নেওয়া হয় এবং প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মাছ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শাহ আলম, আব্দুল লতিফ ও ইন্তাজুলের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
মাছের পোনা অবমুক্ত করতে পেরে ভূমিহীন কৃষকরা আনন্দ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, দীর্ঘদিন পর নিজেদের সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এখন তারা মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহের স্বপ্ন দেখছেন। একই সঙ্গে অতীতে পুকুরের সম্পদ নষ্ট ও আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। ভূমিহীন কৃষক মাজেদা খাতুন, শেলকি বেওয়া, লতিফা বেগম, বেলাল ও মোখলেছুর রহমানসহ অনেকে জানান, প্রতিপক্ষের কারণে তারা এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যেকোনো সময় পুকুরের ক্ষতি করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রশাসনের সার্বক্ষণিক নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মানিক মেম্বার বলেন, “আমি ২০০৮ সালে মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার পর এই ছয়টি খাস পুকুর ২৯টি ভূমিহীন পরিবারের নামে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিই। পরবর্তীতে প্রভাবশালী একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে পুকুরগুলো দখলে রাখে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা পুকুরগুলো প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ভূমিহীনদের মধ্যকার তিনজনের কারণে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। তাদের বিরুদ্ধে পুকুরের মাছ ও গাছ বিক্রি করে প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।”
এ বিষয়ে রহিমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান হান্নু বলেন, “পুকুরগুলো সরকারিভাবে ভূমিহীন কৃষকদের নামে বরাদ্দকৃত। উপকারভোগীদের মধ্যে কিছু বিরোধ থাকলেও এখন তারা নিজেরাই পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করেছেন। আশা করি, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মাছ চাষ করে উপকৃত হবেন।” এদিকে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমে বরাদ্দপ্রাপ্ত ভূমিহীন পরিবারগুলো যাতে নির্বিঘ্নে মাছ চাষ করতে পারে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জে/এ
