
আকবর হায়দার কিরন
ফোন বাজতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত সেই প্রাজ্ঞ, গম্ভীর স্বর। বহু দিন পর শুভানুধ্যায়ী, প্রবীণ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সরকার কবীর উদ্দিন ভাইজানের সাথে কথা হচ্ছিল। সৌজন্য বিনিময়ের পর কথা গড়াচ্ছিল নানা দিকে—হঠাৎ করেই আলাপের বাঁক নিল সাহিত্য, ইতিহাস আর দুই মহীরুহ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও দর্শনের দিকে।
কথোপকথনের একপর্যায়ে উঠে এলো রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত সেই চরণ—”সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ করনি।”
কবীর ভাই গভীর অনুভূতির সাথে প্রশ্ন তুললেন—বাঙালি সমাজ ও মানুষের চরিত্র অনুধাবন করে আজ থেকে ১০০ বছর আগেই রবীন্দ্রনাথ যে কথাটি উপলব্ধি করেছিলেন, তা কীভাবে তাঁর কলমে উঠে এলো? অথচ রবীন্দ্রনাথের এই কালজয়ী সাহিত্যিক ও দার্শনিক মূল্যায়নের পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যকর্মে বঙ্গভূমির বিশাল এক জনগোষ্ঠীর অনুপস্থিতি আজও আমাদের ভাবায়।
কবীর ভাই অত্যন্ত খোলামেলাভাবে ও তাঁর স্বাতন্ত্র্যসূচক ভঙ্গিতে তাঁর নিজস্ব পাঠের অনুভূতি ব্যক্ত করলেন। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিপুল সাহিত্যে বঙ্গভূমির হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর সমাজচিত্র ফুটিয়ে তুললেও তদানীন্তন পূর্ব বাংলার বিরাট সংখ্যাগুরু মুসলিম সমাজের জীবনচিত্র বা আত্মপরিচয়কে তেমনভাবে স্পর্শ করেননি। অথচ শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে জমিদারি পরিচালনা, জমিদারি ব্যাংক বা গ্রামীণ ঋণের আধুনিক ধারণার বিকাশ, এমনকি বাউল সম্রাট লালন শাহের সাথে দীর্ঘ আড্ডা ও ভাবের আদান-প্রদান থাকা সত্ত্বেও সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন খুব একটা ঘটে ওঠেনি।
আলাপে আরও উঠে এলো ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট। ১৯১১ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে গড়ের মাঠে (বর্তমান ব্রিগেড গ্রাউন্ড) তৎকালীন সুশীল সমাজের একাংশের ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা এবং লর্ড কার্জনের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি নিয়েও কিছু স্মৃতি ও সত্য অনুধাবন করা গেল।
তবে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যকার সম্পর্কের মধুর অধ্যায়টিও আমাদের আলোচনায় বেশ উজ্জ্বলভাবে উঠে আসে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন হুগলী জেলার ব্যান্ডেল জেলে রাজবন্দি হিসেবে আমরণ অনশন পালন করছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে লিখেছিলেন—”তুমি অনশন ধর্মঘট পরিত্যাগ করো, তোমাকে আমাদের প্রয়োজন আছে।” এক মহান কবির প্রতি অন্য এক মহান কবির এই অনন্য স্বীকৃতি চিরভাস্বর।
রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি আড্ডায় প্রধান হয়ে উঠলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় নজরুলের দীর্ঘ দিন অবস্থান, সিএমওবি প্রাঙ্গণে ইকবাল বাহার চৌধুরী ভাইদের পারিবারিক ঐতিহ্যমণ্ডিত বাড়িতে নজরুলের অবস্থান এবং তাঁদের ফুফু নাহারকে ঘিরে গান ও কবিতার রচনার স্মৃতিচারণ আমাদের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে। নজরুল কীভাবে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে, ‘কেরেস্তান বাঙালি’ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের জীবনের কথা তাঁর সাহিত্য ও গানে তুলে ধরেছেন—তা স্মরণ করে কবীর ভাই আজও নজরুলকে তাঁর হৃদয়ের কবি হিসেবে শ্রদ্ধা জানান।
আমাদের প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ গুণীজনেরা যখন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আর প্রত্যক্ষ অনুভূতির গল্পগুলো তুলে ধরেন, তখন মনে হয় সাহিত্যের এই অমূল্য স্মৃতিগুলো রক্ষা করা আমাদের অন্যতম অনুভূতির দায়িত্ব। এক সময়ের মুখোমুখি দেখা হওয়া বা দূরভাষের এই অন্তরিক আলাপগুলো শুধু কথার কথা নয়, বরং বাংলা সাহিত্য ও সামাজিক ইতিহাস অনুধাবনের এক অনবদ্য দলিল !
* এম আব্দুর রাজ্জাক *