
বিশেষ প্রতিবেদক|ঢাকা|০৪ অক্টোবর ২০২৬
রাজধানীর বেইলি রোডের অভিজাত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স (হিল ট্র্যাক্স ভবন) মিলনায়তনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বিতর্কিত রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি। বিচারিক আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং ফৌজদারি মামলার ওয়ারেন্টকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জামায়াত নেতাদের ঠিক পাশেই মঞ্চে আসীন ছিলেন একাধিক মামলার পলাতক আসামি ও চট্টগ্রাম বন্দরের কুখ্যাত চোরাচালান সিন্ডিকেটের হোতা মো. বেলাল হোসেন। চতুর্থ শ্রেণির একজন এমভি মেকানিক্যাল ড্রাইভার থেকে ভুয়া সার্টিফিকেটের জোরে নিজেকে ‘ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে জাহিরকারী এই ব্যক্তির জামায়াত নেতাদের মঞ্চে উপস্থিতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে দেশজুড়ে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে হিল ট্র্যাক্স ভবনে আয়োজিত উক্ত বিতর্কিত অনুষ্ঠানটি পরিচালনা বা আয়োজনের ওপর সুনির্দিষ্ট আইনি নিষেধাজ্ঞা বা ইনজাংকশন ছিল। ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালত-৩ থেকে অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখার স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে পেশিশক্তি ও প্রভাব খাটিয়ে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। আর এই বেআইনি আয়োজনের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে ও জামায়াত নেতাদের ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে দেখা যায় ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি মো. বেলাল হোসেনকে। প্রশ্ন উঠেছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এমন একজন দাগী আসামি কীভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের মঞ্চে প্রোটোকল পান?
অভিযুক্ত মো. বেলাল হোসেনের মূল পেশাগত পরিচয় একজন চতুর্থ শ্রেণির এমভি মেকানিক্যাল ড্রাইভার (ট্রাক ও মেকানিক্যাল চালক)। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক সেবা সংগঠন ‘এপেক্স বাংলাদেশ’-এর একজন বহিষ্কৃত সদস্য। কিন্তু নিজের আসল পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে নিজেকে উচ্চপদস্থ ‘ইঞ্জিনিয়ার’ বা প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন।
তার এই পরিচয় সম্পূর্ণ ভুয়া ও প্রতারণামূলক বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তার অর্জিত এসএসসি, এইচএসসি এবং ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে। ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে পেশাগত প্রতারণার দায়ে তার বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি, দেশের পেশাদার প্রকৌশলীদের শীর্ষ সংগঠন থেকেও তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি এবং নামের আগে অবৈধভাবে ‘ইঞ্জিনিয়ার’ পদবি ব্যবহারের দায়ে পৃথক আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানী তথ্যে আরও বেরিয়ে এসেছে যে, গত ১৬ বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের শ্রমিক লীগের নাম ভাঙিয়ে এক বিশাল চোরাচালান সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছে এই বেলাল। বন্দরকেন্দ্রিক টেন্ডারবাজি, চোরাচালান এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে পালিয়ে বেড়ালেও বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মদদে ও ছত্রছায়ায় সে কীভাবে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল। জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার কলাবাগান থানায় তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলার এজাহারভুক্ত ২ নম্বর আসামি হিসেবে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও ওয়ারেন্ট ঝুলছে। এত গুরুতর অভিযোগ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় থাকার পরও পুলিশ প্রশাসনের চোখের সামনে সে কীভাবে বেইলি রোডের মতো ভিআইপি এলাকায় জামায়াত নেতাদের পাশে মঞ্চে প্রধান অতিথির আসনে বসল, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
বিচারিক আদালতের আদেশ অমান্য করা, সার্টিফিকেট জালিয়াতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফাইল প্রসেসিংসহ আইনি নোটিশ, এবং চট্টগ্রাম বন্দরের চোরাচালান সিন্ডিকেটের মূলহোতা মো. বেলাল হোসেনের মতো একজন ভুয়া প্রকৌশলী ও পলাতক আসামির এমন বেপরোয়া আচরণ দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি চরম উপহাস।
সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের দাবি আদালতের অবমাননাকারী, ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি এবং সার্টিফিকেট জালিয়াতির এই মূলহোতাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক এবং জামায়াত নেতাসহ এই সিন্ডিকেটের পেছনের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক।