বৃহস্পতিবার ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩

নিষিদ্ধ সীমানা

[print_bangla]

নিষিদ্ধ সীমানা
বিধান চন্দ্র সান্যাল

বালুরঘাটের আত্রাই নদীর তীর ঘেঁষা নির্জন রাস্তা। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৭ টা বেজে পনেরো মিনিট। বাতাস বইছে হালকা, কিন্তু তার মধ্যেও কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনা। প্রসূন পকেট থেকে সিগারেট বের করতে গিয়েও থামল। তার চোখ জোড়া স্থির হয়ে আছে ঠিক সামনের একটা অশ্বত্থ গাছের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ইন্দ্রাণী । ইন্দ্রাণীর পরনে একটা গাঢ় নীল রঙের সালোয়ার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, তার দুই হাতের মুঠোয় একটা ভারী কালো রঙের ক্যামেরা। প্রসূণ একটু এগিয়ে গিয়ে ডাকল, “ইন্দ্রাণী! তুমি এখানে কী করছ? আমি তো তোমাকে কফি শপে ওয়েট করতে বলে ছিলাম।” ইন্দ্রাণী চমকে ফিরে তাকাল। তার চোখে এক অদ্ভুত ভয় আর আতঙ্কের ছাপ। সে ক্যামেরাটা বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,” প্রসূন, এখান থেকে চলো। খুব তাড়াতাড়ি এখান থেকে বের হতে হবে। ওরা আমাদের ফলো করছে।”
“কারা ফলো করছে?” প্রসূন ইন্দ্রাণীর কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, “কী এসব ধাঁধা বলছ? সকালে বললে ছবি তুলতে যাচ্ছ, আর এখন বলছ ওরা ফলো করছে। ব্যাপার কী?”
ইন্দ্রাণী কাঁপতে কাঁপতে ক্যামেরাটা প্রসূনের হাতে গুঁজে দিল। ঠিক তখনই নদীর ওপার থেকে ভেসে এল একটা তীক্ষ্ণ হুইসেলের শব্দ। প্রসূন বুঝতে পারল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। সে ইন্দ্রাণীর হাত টেনে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। তাদের গন্তব্য এখন শহরের কোলাহলপূর্ণ এলাকা। প্রসূন আর ইন্দ্রাণী হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছাল বালুরঘাটের সরকারি কলেজ মোড়ের কাছে। শহরের আলো-ঝলমলে পরিবেশ দেখে ইন্দ্রাণী কিছুটা ধাতস্থ হলো। একটা নির্জন চায়ের দোকানে বসে তারা কফিতে চুমুক দিল। প্রসূন পকেট থেকে সেই কালো ক্যামেরাটা বের করল। সে ইন্দ্রাণীর দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার আমাকে সত্যিটা বলো, ইন্দ্রাণী। এই ক্যামেরায় এমন কী আছে যার জন্য তোমরা পিছু নেওয়া হয়েছে?” ইন্দ্রাণী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল, “তুমি তো জানো আমি বালুরঘাট মিউজিয়ামের অ্যাসিস্ট্যান্ট কিউরেটর হিসেবে যোগ দিয়েছি। গত সপ্তাহে মিউজিয়ামে একটা প্রাচীন পুঁথি আর একটা ডায়মন্ড নেকলেস আসে। ওগুলো কোনো সাধারণ জিনিস নয়।”
“তাহলে কী সেগুলো?” প্রসূন কিছুটা অবাক হলো। “ওগুলো প্রাচীন গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়ের। আর এই জিনিসগুলো চুরি করার জন্য একটা আন্তর্জাতিক স্মাগলার চক্র শহরে ঢুকে পড়েছে।” ইন্দ্রাণী ফিসফিস করে বলল, “আমি যখন মিউজিয়ামের সিকিউরিটি ফুটেজ চেক করছিলাম, তখন দেখতে পাই মিউজিয়ামের ডিরেক্টর নিজেই সেই চক্রের সাথে জড়িত। তিনি আমাকে দেখে ফেলেন। এরপরই আমি ক্যামেরাটা নিয়ে পালিয়ে আসি।” প্রসূন ইন্দ্রাণীর দিকে তাকিয়ে দেখল তার চোখে-মুখে কতটা ভয় কাজ করছে। সে ইন্দ্রাণীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “ভয় পেয়ো না ইন্দ্রাণী, আমি তোমার সাথে আছি। আমরা সোজা পুলিশে যাব।”
কিন্তু সমস্যা হলো, ঠিক সেই সময়ে চায়ের দোকানের টিভি স্ক্রিনে ব্রেকিং নিউজ ভেসে উঠল। সেখানে বলা হচ্ছে, বালুরঘাট মিউজিয়ামে এক মারাত্মক ডাকাতি হয়েছে এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইন্দ্রাণীর নিজের লকার থেকেই সেই ঐতিহাসিক জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ ইন্দ্রাণীর নামে ওয়ারেন্ট জারি করেছে। ইন্দ্রাণী হতবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এ কী করে সম্ভব? আমি তো ওগুলো ছুঁইনি পর্যন্ত! ওরা আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।”
প্রসূন বুঝতে পারল, ডিরেক্টরের ক্ষমতা অনেক বেশি। তারা এখন চাইলেও পুলিশের কাছে যেতে পারবে না, কারণ পুলিশ তাদেরই অপরাধী ভাববে। প্রসূন বলল, “ইন্দ্রাণী, আমাদের বালুরঘাট ছাড়তে হবে। কাল সকালেই আমরা শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেব। সেখান থেকে নেপাল বর্ডার পার হয়ে যাওয়া সহজ হবে।” তারা সেই রাতটা কাটানোর জন্য শহরের এক গোপন লজের দিকে রওনা হলো। রাতের আঁধারে যখন তারা হেঁটে যাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল প্রতিটা ছায়া যেন তাদের পিছু নিচ্ছে।
লজের ছোট ঘরে বসে প্রসূন ক্যামেরাটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। ডিজিটাল ক্যামেরার মেমোরি কার্ডটা বের করে সে তার ল্যাপটপে কানেক্ট করল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠল অনেকগুলো ছবি। ইন্দ্রাণী অবাক হয়ে বলল, “এগুলো কী? আমি তো মিউজিয়ামের ডিরেক্টরের ছবি তুলিনি!” প্রসূন ছবিগুলো জুম করে দেখল। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ডিরেক্টর বালুরঘাটের এক হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক নেতার সাথে হাত মেলাচ্ছেন এবং সেই নেতার ল্যাপটপ থেকে কিছু ফাইল ট্রান্সফার করা হচ্ছে। প্রসূন বলল, “ইন্দ্রাণী , তুমি বুঝতে পারছ না, এটা শুধু চুরি নয়। এটা একটা বিশাল বড় রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র। এই ছবিগুলো তোমার কাছে থাকা মানে তুমি তাদের সব গোপন তথ্য জেনে গেছ।” ইন্দ্রাণী প্রসূনের কাঁধে মাথা রেখে কেঁদে ফেলল। সে বলল, “আমি শুধু বাঁচতে চাই, প্রসূন। আমি এসবের মধ্যে জড়াতে চাইনি।”
প্রসূন তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিল। কিন্তু তার মনটাও তখন এক অজানা আশঙ্কায় কাঁপছিল। ইন্দ্রাণীকে রক্ষা করার জন্য সে যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত। পরের দিন সকাল। সূর্য ওঠার আগেই প্রসূন আর ইন্দ্রাণী বালুরঘাট বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা হলো। কিন্তু কপাল খারাপ। বাসস্ট্যান্ডের ঠিক প্রবেশপথেই দুটো কালো রঙের এসইউভি গাড়ি তাদের পথ আটকে দাঁড়াল। গাড়িগুলো থেকে তিনজন সশস্ত্র লোক নেমে এল। তাদের সবার হাতে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। তাদের লিডার এগিয়ে এসে বলল, “ক্যামেরাটা আমাদের হাতে তুলে দাও, মিস ইন্দ্রাণী। আর যদি বুদ্ধিমানের মতো কাজ করতে চাও, তাহলে চুপচাপ আমাদের সাথে চলো।” প্রসূন ইন্দ্রাণী কে আড়াল করে দাঁড়াল। সে তার পকেট থেকে একটা ছোট সুইস নাইফ বের করল, যদিও জানে এই বন্দুকধারীদের সামনে এটা কিছুই না। প্রসূন বলল, “তোমরা ওদের হাতে ক্যামেরা তুলে দিতে পারো না। আমি পুলিশকে খবর দিয়েছি, তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে পৌঁছাবে।” লিডারটি হেসে বলল, “তোমার পুলিশ আসার আগেই আমরা তোমাদের আত্রাই নদীতে ভাসিয়ে দেব। ধরো ওদের!” লোকগুলো তেড়ে এল। ঠিক তখনই প্রসূন একটা জাদুকরী চাল চলল। সে বাসস্ট্যান্ডের পাওয়ার সাপ্লাইয়ের তারে সজোরে লাথি মারল, যার ফলে চারপাশের সমস্ত আলো নিভে গেল এবং একটা বিকট শব্দে স্পার্ক হলো। অন্ধকারে শুরু হলো ধস্তাধস্তি। প্রসূন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে লোকগুলোকে ঠেকাতে লাগল। ইন্দ্রাণীও চুপ করে বসে রইল না। সে লিডারের মাথায় তার হাতের ভারী ভ্যানিটি ব্যাগ দিয়ে সজোরে আঘাত করল। লিডারটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। প্রসূন সুযোগ বুঝে লিডারের হাত থেকে পিস্তলটা ছিনিয়ে নিল। প্রসূন পিস্তলটা উঁচিয়ে বলল, “এক পা-ও এগোবে না কেউ!” ঠিক সেই সময়েই সাইরেনের শব্দ শোনা গেল। পুলিশের গাড়িগুলো সেখানে এসে হাজির হলো। প্রসূন আর ইন্দ্রাণীর বুদ্ধিমত্তায় পুলিশ আগেই খবর পেয়েছিল এবং পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছিল। স্মাগলার চক্রের সবাই পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। মিউজিয়ামের ডিরেক্টর এবং সেই রাজনৈতিক নেতাও রেহাই পেল না। সবকিছু শান্ত হওয়ার পর, প্রসূন আর ইন্দ্রাণীকে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে পুরো ঘটনা জানানোর পর ইন্দ্রাণীর ওপর আরোপিত সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো এবং তাকে নিরাপদে তার কর্মস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া হলো।
বালুরঘাট শহরের আত্রাই নদীর ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে প্রসূন আর ইন্দ্রাণী। ইন্দ্রাণী প্রসূনের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “প্রসূন, তুমি না থাকলে আজ আমার কী হতো আমি জানি না।” প্রসূন ইন্দ্রাণীর হাত ধরে বলল, “আমি তোমায় কোনো দিন বিপদে পড়তে দেব না, ইন্দ্রাণী। আমাদের ভালোবাসার শুরুটা হয়তো ভয় আর আতঙ্কের মধ্য দিয়ে হয়েছিল, কিন্তু এর শেষটা হবে এক সুন্দর ভবিষ্যতের পথে।” ইন্দ্রাণী প্রসূনের বুকে মাথা রাখল। নদীর স্রোত তখনো বয়ে চলেছে, আর তাদের ভালোবাসার গল্পটাও মিশে গেল আত্রাইয়ের চিরন্তন স্রোতে। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নিষিদ্ধ সীমানা

২৯ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top